বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিকভাবে একদমি ভালো নেই। দেশের এই বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটির সঙ্গে তার শরিক দলের যোগাযোগ আগের থেকে অনেক কমে গেছে। মূলত বিএনপির শরিক দলের নেতাকর্মীদের অবস্থাও খুব একটা ভালো না। বিএনপির শরিক দল গুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দেশের এই রাজনৈতিক দলের একাধিক জিনিয়র নেতা না ফেরার দেশে চলে গেছেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী এখনো বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন। তবে সব থেকে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে জামায়াতে ইসলামীর বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে বড় অভিযোগে মামলা হয়েছে। এই অবস্থায় ধীরে ধীরে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব বেড়ে চলেছে। বিএনপির মধ্যে প্রায় সময় জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে নানা রকম আলোচনা চলছে। এবার সংবাদে উঠে এলো যেসব কারণে জামায়াত ছাড়তে চায় বিএনপি।

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপি দূরত্ব রক্ষা করে চলছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ বিএনপির ভেতর থেকেই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কী কারণে এই উদ্যোগ—সে সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে নানা প্রত্যাশা ও রাজনীতির হিসাব-নিকাশের কথা।

দলটির নেতারা বলছেন, প্রথমত, জামায়াতকে ছাড়তে পারলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের পাশাপাশি প্রধান প্রতিবেশী ভারতেরও সমর্থন পাওয়া যাবে। দ্বিতীয়ত, জামায়াত পাশে না থাকলে উদার ও বামপন্থী দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গঠন করা যাবে। তৃতীয়ত, ’জামায়াত-বিএনপি বা খালেদা-নিজামী’ বলে জনমনে সৃষ্ট নেতিবাচক পাবলিক পারসেপশনও এতে দূর হবে বলে মনে করছে বিএনপি।

ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে অগ্রসর হতে চাইছে বিএনপি। দলটির নেতাদের মতে, ভারত ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যমূলক সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলার কারণেই বর্তমান সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে। তাই জামায়াতকে এখনই দূরে রেখে বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি বলে বিএনপির উদারপন্থী নেতারা মনে করেন।

তাঁদের মতে, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছাড়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত কঠিন, যদিও স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারসহ দু-একজন নেতা এর বিরোধিতা করছেন। কিন্তু দলটির মধ্যে দক্ষিণপন্থী নেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় উদারপন্থীদের মতামতই গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানা গেছে।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের দাবি, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সম্পর্কোন্নয়নের দিক থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও এখন উদারপন্থীদের উদ্যোগকেই সমর্থন করছেন। শুধু চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ’সবুজ সংকেত’ দিলেই জামায়াত প্রশ্নে নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।

যদিও ভোটের রাজনীতিতে উদার ও বামপন্থী দলগুলোর তুলনায় জামায়াতের প্রভাব বেশি বলে মনে করা হয়। সে কারণেই জামায়াতকে ছাড়লে বিএনপির কী লাভ হবে বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদৌ পাওয়া যাবে কি না—এমন আলোচনা বেশ কয়েক বছর ধরেই বিএনপির ভেতরে-বাইরে ঘুরপাক খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গত ৪ সেপ্টেম্বর শনিবার দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জামায়াতকে দূরে রাখার কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা ওঠে। নেতিবাচক পাবলিক পারসেপশন ও আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায়ের বিষয়টি সেখানেও আলোচনা হয়।

জানতে চাইলে বিএনপির ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সদস্য শামা ওবায়েদ গণমাধ্যমকে বলেন, ’জামায়াতের সঙ্গে জোট থাকা না থাকার বিষয়ে দলের হাইকমান্ড সিদ্ধান্ত নেবে। তবে বৈশ্বিক রাজনীতির পাশাপাশি তালেবানের উত্থানের পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন রাজনীতির সঙ্গে অবশ্যই আমাদের সমন্বয় করতে হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির এই সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ’নব্বইয়ের দশকের সঙ্গে ২০২১-এর তুলনা করলে ভুল হবে। তা ছাড়া এ দেশের একজন নাগরিক হিসেবে মনে করি, ভারতেরও রিয়ালাইজেশন হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে নয়, পিপল টু পিপল এবং কান্ট্রি টু কান্ট্রি রিলেশনশিপ ডেভেলপ করতে হবে। তাহলেই পারস্পরিক সমস্যাগুলো সমাধানে সুবিধা হবে।’

জামায়াতের নাম না নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ’দেশব্যাপী বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের’ ঘটনায় নিন্দা জানান।

গ্রেপ্তারের আগে জামায়াতের সাত নেতা মূলত আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠক করছিলেন, যে ঘটনাকেও বিএনপি সন্দেহের চোখে দেখছে বলে জানা যায়। ঘটনার দিন সেখানে জামায়াতের জাতীয় নির্বাচন কমিটির একটি সভা ছিল। গ্রেপ্তারকৃত নেতারা সবাই জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য।

জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকেকে বলেন, ’২০ দলীয় জোটের শরিক দল জামায়াতকে নিয়ে নানামুখী আলোচনা হলেও তারা থাকবে কি থাকবে না সে সিদ্ধান্ত দলের স্থায়ী কমিটি নেবে। তবে এখন পর্যন্ত তারা ২০ দলীয় জোটের শরিক দল আছে।’ তিনি জানান, বৃহত্তর ঐক্য প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে বিএনপি কাজ করছে।

জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম কে বলেন, ’বিএনপির ভেতরে কী আলোচনা হয়েছে সেটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো বার্তা এখনো আসেনি।’ তিনি বলেন, ’আমাদের মধ্যে প্রকাশ্যে বৈঠক না হলেও নানা কথাবার্তা হয়। তাই বলা যায়, ২০ দলীয় জোটে জামায়াত এখনো আছে।’ সূত্র:কালের কণ্ঠ



উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তবে বর্তমানে এই দুই রাজনৈতিক দলের অবস্থা খুব খারাপ। এই পরিস্থিতির মধ্যে দলের এক অংশ বলছে জামায়াতে ইসলামীকে এখন ছাড়া ঠিক হবে না। আবার অপর অংশ বলছে জামায়াতে ইসলামীকে এখনি ছাড়লে ভালো হবে। বর্তমানে এই বিষয়টি নিয়ে বিএনপির মধ্যে বেশ আলোচনা চলছে। তবে এখনো দলটি কোনো রকম সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। ২০ দলীয় জোটে জামায়াতে ইসলামী থাকবে কিনা এই বিষয়ে সিদ্ধন্ত নিতে গেলে অবশ্যই জোটের সকল নেতাদের মতামত থাকতে হবে। তবে এই বিষয়ে এখনো ২০ দলীয় জোটে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।