কোনও হাতুড়ি শাবল কুড়োলের শক্তি নেই সে বাড়িটি ভাঙে : তসলিমা নাসরিন

সম্প্রতি নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরীন পৈত্রিক বাড়িটি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। যেখানে জীবনের অনেকটা সময় পার করেছেন এই বাড়িতে। শৈশবের দিনগুলির স্মৃতিচারন করেন এবং বিভিন্ন কথা তুলে ধরেন এই লেখিকা। বাড়িটি ভাঙ্গার বিষয়টি নিয়ে নিজের কষ্টগুলো শেয়ার করে যা জানালেন এই লেখিকা।

বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরীন তার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন ময়মনসিংহ নগরের টিএন রায় রোডের ‘অবকাশ ভবন’ নামে এই বাড়িতে। বাড়িটি তসলিমা নাসরিনের কারণেই শহরবাসীর কাছে পরিচিত।

সম্প্রতি তসলিমা নাসরিনের স্মৃতি জড়িত বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়। এখন ওই স্থানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ডেভেলপার কোম্পানির বিশাল সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে।

বুধবার (৯ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে চারটার দিকে টিএন রায় রোড ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়।

এসময় তিন শ্রমিককে ভাঙা ঘরের দেয়াল থেকে ইট সরাতে দেখা যায়। পুরো বাড়ি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। এখন তারা একটি ছোট অংশ ভাঙছেন।

জানতে চাইলে শ্রমিকরা জানান, নয়ন নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি লিখিত দলিল দিয়ে তিন লাখ টাকায় পুরনো বাড়ির ইট-কাঠ ও রড কিনেছেন। আমরা তার অধীনে শ্রমিক হিসেবে ঘরবাড়ি ভাঙছি। এর বাইরে আমরা কিছুই জানি না।

তসলিমা নাসরিনের ভাতিজা সাফায়েত কবির দেশের একটি জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমেকে বলেন, বাড়িটি আমার নানার প্রয়াত ডা. রজব আলীর। তাঁর মৃ/ত্যুর পর এই বাড়ির জমি সম্প্রতি তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। এর সামনেই আমার বাবা আর চাচার জায়গা। আর পেছনে ফুফুদের জায়গা।

সাফায়েত আরও বলেন, জমি বণ্টনের নিয়ম অনুযায়ী পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি আমাদের পারিবারিক বিষয় এবং এতে কোনো আইনি সমস্যা নেই।

এদিকে কয়েকদিন আগে তসলিমা নাসরিন তার নিজের ফেসবুক আইডিতে শৈশব ও যৌবনের নানা স্মৃতি তুলে ধরে পোস্ট করে আলোচনায় উঠে আসে ‘‘অবকাশ ভবন।

ফেসবুক পোস্টে তসলিমা লিখেছেন:

কেউ কেউ ফেসবুকে ‘অবকাশের’ ছবি পোস্ট করছেন, দঃখ প্রকাশ করেছেন, স্মৃতিচারণ করছেন। আমার শৈশব, কৈশোর, যৌবনের সেই ‘অবকাশ’। ময়মনসিংহ শহরের টিএন রায় রোডে বাবার কেনা সুন্দর বাড়িটি। আমার কোন যোগাযোগ নেই, যারা এই অবকাশকে পিষ্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। শুধু এইটুকু জেনে রাখুন, এদের কেউ কেউ খুব লোভী, স্বার্থপর, গোঁড়া, কেউ আবার কট্টর মৌলবাদী। আমি সবার চক্ষুশূল। একসময় শহরের সাহিত্য সংস্কৃতি, জ্ঞান ও প্রগতির কেন্দ্রস্থল বাড়িটি এখন ধ্বংসস্তূপ। প্রগতিশীলতা, উদারতা, মমতা, স্মৃতি ও সৌন্দর্যের কোনো মূল্য নেই সম্পদের দরিদ্রদের কাছে। বাড়িতে মায়ের লাগানো সব ফল ও ফুলের গাছ উপড়ে ফেলে আধুনিক বহুতল ভবন তৈরি হচ্ছে বলে শুনেছি। আমার কর্মঠ পিতার অদক্ষ বংশধররা আগামী প্রজন্মের জন্য সেই ভবনে বসে পার ওপর দিয়ে খাবে।

এখন আমি সেই বাড়ির কেউ নই। আমি ত্রিশ বছর বয়সী.
ইট,পাথর,চুনে,কংক্রিটে,কাঠে স্মৃতি নেই,স্মৃতি আছে মনে। অবকাশ আ/মার মনে রইলো। যে বাড়িতে আমি আমার প্রথম কবিতা লিখেছিলাম, আমার প্রথম কবিতা পত্রিকা ছাপিয়েছিলাম, আমার প্রথম কবিতার বই লিখেছিলাম, আমার নির্বাচিত কলাম লিখেছিলাম, উঠোনে আমার প্রথম গোল্লাছুট খেলেছিলাম, ছাদে আমার প্রথম পুতুল খেলেছিলাম, রবীন্দ্রনাথকে আমার বাড়ির ভিতরে নিয়ে গিয়েছিলাম, মঞ্চস্থ করেছি, যে বাড়িতে দাদা বেহালা বাজাতেন, ছোট মেয়ে গিটার বাজাতেন, বোন গান গাইতেন, মা আবৃত্তি করতেন, বাবা মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে বাড়িতে আমি আমার প্রথম প্রেমপত্র লিখেছিলাম, যে বাড়িতে আমি সংবেদনশীল ও সচেতন হয়ে উঠেছিলাম একই সময়ে, সেই বাড়িটি আমার মনে রইলো। কোনও হাতুড়ি শা/বল কুড়োলের শক্তি নে/ই সে বাড়িটি ভাঙে।

প্রসঙ্গত, বাড়িটি ভাঙ্গায় মনে কষ্ট নিয়ে পরিবারের লোকজনের ওপর ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই লেখিকা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন কিছু মানুষ তাদের এই বাড়িটা লোভের কারনে ভেঙ্গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *