বিশ্বকাপে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়ে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে বাংলাদেশ। এই সিরিজে ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং সবখানেই খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ছিল একেবারেই বাজে। আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ ও বিশ্বকাপ মিশন শেষ করে দেশে ফিরে কয়েকদিনের মধ্যেই এই সিরিজ খেলতে যায় টাইগাররা।
শ্রীলঙ্কা সিরিজে অনেক জায়গায় ঘাটতি ছিল বাংলাদেশের। প্রথমত, প্রায় আড়াই মাস ইউরোপ সফর করে এসে খেলোয়াড়দের মধ্যে একটি ক্লান্তি ভাব ছিল। দ্বিতীয়ত, দলের ছন্দে থাকা কয়েকজন পারফর্মার শ্রীলঙ্কা সফরে ছিলেন না। ছিলেন না নিয়মিত অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। ছিল না দলের প্রধান কোচসহ অন্যসব কোচিং স্টাফের সদস্যরা।


বিশ্বকাপ শেষে প্রধান কোচ স্টিভ রোডসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বিসিবি। এই মুহূর্তে বিসিবির জন্য আসল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মাশরাফি-সাকিব-মুশফিকদের জন্য সেরা কোচ খুঁজে বের করা। শোনা যাচ্ছে, টাইগারদের সাবেক কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহেকে আবার ফিরিয়ে আনা হতে পারে। কিন্তু পুরাতন কোচকে ফিরিয়ে আনা হলে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হবে? শ্রীলঙ্কা সফর থেকে বিসিবির কী শিক্ষা নেয়া উচিত? এসব বিষয় নিয়ে গনমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক পরিচালক খন্দকার জামিল উদ্দিন।

শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের হতাশাজনক সিরিজ নিয়ে আপনার মূল্যায়ন?

খন্দকার জামিল উদ্দিন: এই সিরিজে এমন ফলই হওয়ার কথা ছিল। কারণ, বাংলাদেশ আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলেছে, লম্বা সময় ধরে বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। বিশ্বকাপে ৯টি ম্যাচ খেলেছে। ইউরোপে দল প্রায় আড়াই মাসের সফর করে এসেছে। লম্বা এই সফর শেষে খেলোয়াড়রা সব ক্লান্ত ছিল। বিশ্বকাপ শেষে খেলোয়াড়দের বিশ্রামের প্রয়োজন ছিল। সিরিজটা যদি আরো এক মাস পরে আয়োজন করা হতো তাহলে আমরা এর চেয়ে ভালো ফল পেতে পারতাম। এই সিরিজে খেলোয়াড়দের মধ্যে ক্লান্তি ভাব ছিল। মাঠে ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং কোনোটিতেই খেলোয়াড়দের মধ্যে চনমনা ভাব ছিল না। সবদিক থেকে ছন্নছাড়া মনে হয়েছে। বিশ্বকাপ শেষ করে এসেই অ্যাওয়ে সিরিজ। যদি হোম সিরিজ হতো তাও একটা কথা ছিল। তাছাড়া এই সিরিজে প্রধান কোচ ছিল না। ব্যাটিং কোচ নেইল ম্যাকেঞ্জি আসেননি। সুতরাং, এখানে বাংলাদেশের বড় একটা ঘাটতি ছিল।

সিরিজে অন্তর্বর্তীকালীন কোচ খালেদ মাহমুদ সুজনের ভূমিকাকে কীভাবে দেখছেন?

খন্দকার জামিল উদ্দিন: খালেদ মাহমুদ সুজনকে এক সিরিজ দিয়েই বিবেচনা করতে চাই না।

শ্রীলঙ্কায় দলের ভরাডুবি। এর মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় সুজনকে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, সুজন ক্যাসিনোতে গেছেন। বিষয়টি নিয়ে কিছু বলবেন?

খন্দকার জামিল উদ্দিন: এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। বিষয়টি বিসিবি দেখবে।

মাশরাফি-সাকিবের না থাকাটা এই সিরিজে দলের উপর কতটুকু প্রভাব ফেলেছে?

খন্দর জামিল উদ্দিন: সাকিব না থাকলে তার জায়গায় দুইজন খেলোয়াড় লাগে। সাকিব না থাকায় একটা শূন্যতা ছিল। তাছাড়া শেষ মুহূর্তে এই সিরিজ থেকে মাশরাফি বিন মর্তুজা ও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ছিটকে যায়। লিটন দাস ছুটিতে ছিল। এসব খেলোয়াড় কিন্তু বিশ্বকাপে অসাধারণ খেলে এসেছে। সুতরাং, ছন্দে থাকা খেলোয়াড়রা না থাকায় দলের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

অধিনায়ক হিসাবে তামিমকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

খন্দকার জামিল উদ্দিন: হঠাৎ করে তামিমকে অধিনায়ক করা ঠিক হয়নি। বিশেষ অ্যাওয়ে সিরিজে তাকে অধিনায়ক করা মোটেও ঠিক হয়নি। তামিম খেলোয়াড় হিসাবে ভালো এতে তো কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অধিনায়ক হিসাবে কোথাও তার সফলতা নেই। ম্যাচে চাপ সামলানো, বোলারদের ব্যবহার করা, ফিল্ডিং সাজানো এসব দিক থেকে তামিম অভিজ্ঞ না।

সম্প্রতি সময়ে দেখা যাচ্ছে, প্রতি ম্যাচেই বাজে বোলিং করছে বাংলাদেশ। সমস্যাটা আসলে কোথায়?

খন্দকার জামিল উদ্দিন: ব্যর্থতার প্রধান জায়গাটি হচ্ছে, নতুন বলে বোলাররা উইকেট নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ্বকাপে এবং এই সিরিজে একই অবস্থা। আপনি যদি শুরুর দিকে উইকেট না নিতে পারেন তাহলে পরে কিন্তু ওই ব্যাটসম্যানরা বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। মোস্তাফিজ-রুবেল ছন্দে নেই। শেষ ম্যাচে তো মোস্তাফিজ ইনজুরির কারণে খেলতেই পারল না। এই সিরিজে শফিউলকে দলে নেয়া হলো। দীর্ঘদিন পর দলে সুযোগ পেয়ে তো সে ভালোই খেলেছে।

টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের টানা ব্যর্থতা নিয়ে কিছু বলবেন?

খন্দকার জামিল উদ্দিন: ব্যাটিংয়ে ওপেনাররা ব্যর্থ। তামিম তো সেই বিশ্বকাপ থেকেই ছন্দে নেই। সৌম্যরও একই অবস্থা। শেষ ম্যাচে বিজয়কে ওপেনিংয়ে নামানো হলো। সেও কিছু করতে পারল না। সাকিব ছিল না। তই নজর ছিল তামিম, মুশফিক, রিয়াদের উপর। মুশফিক ভালো করলেও তামিম-রিয়াদ ছিল ফ্লপ। তাছাড়া বড় পার্টনারশিপ হয়নি। প্রথম ম্যাচে মুশফিক-সাব্বির ভালো একটি জুটি গড়েছিল। কিন্তু তা ৩১৫ রান তাড়া করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। আরেকটি বিষয় হলো, সিনিয়রা ব্যর্থ হলে জুনিয়ররা হাল ধরতে পারে না। কিন্তু জুনিয়রদেরও তো দায়িত্ব নিতে হবে। সব ম্যাচে তো আর সিনিয়ররা ভালো করবে না।

শ্রীলঙ্কা সিরিজ থেকে বিসিবি কী শিক্ষা নিতে পারে?

খন্দকার জামিল উদ্দিন: এই সিরিজ থেকে বিসিবিকে বড় একটা শিক্ষা নিতে হবে। সেটি হলো শক্তিশালী পাইপলাইন তৈরি করতে হবে। দলে সিনিয়র যারা আছে তারা তো সর্বোচ্চ চার-পাঁচ বছর খেলবে। এরপর দলের কী হবে? তাই এখন থেখেই লিগের প্রতি আরো জোর দিতে হবে। আপনারা দেখুন, এই সিরিজে সাকিব-মাশরাফি না থাকায় কী অবস্থা হলো। পাইপলাইনে যদি ভালো খেলোয়াড় থাকতো তাহলে এমন হতো না।

দলের সামগ্রিক দিক নিয়ে সংক্ষেপে কিছু বলুন?

খন্দকার জামিল উদ্দিন: একটা সিরিজ দিয়ে দলের সার্বিক দিক মূল্যায়ন করা যাবে না। এই দলই আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। এই দলই আমাদের আশা দেখিয়েছে। এই দলই অনেক জয় এনে দিয়েছে। সুতরাং, দলটি নিয়ে আমি আশাবাদী। আশা করি, সব ভুল শুধরে সামনে দল ঘুরে দাঁড়াবে।

শোনা যাচ্ছে, সাবেক কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহেকে আবার ফিরিয়ে আনবে বিসিবি। বিষয়টি যদি সত্য হয় তাহলে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হবে?

খন্দকার জামিল উদ্দিন: আমি মনে করি, হাথুরুসিংহেকে ফিরিয়ে আনলে বিসিবি ভুল করবে। তাকে আনা ঠিক হবে না। কারণ তিনি আমাদের অথৈ সাগরে ফেলে চলে গেছেন। তাছাড়া তার সময়ে বেশ ‍কিছু সমস্যা ছিল। তিনি তো মুশফিক-রিয়াদদের শেষ করতে বসেছিলেন। তিনি আসতেন, সিরিজ শেষ করে আবার অস্ট্রেলিয়ায় চলে যেতেন। কিন্তু একজন কোচের কাজ তো তা না। তাকে লিগের খেলাগুলো দেখতে হবে। নতুন খেলোয়াড় তুলে আনতে হবে। আমরা এমন একজন কোচ চাই, যিনি আমাদের সঙ্গে সর্বক্ষণ থাকবেন, সব দিক দেখবেন।

প্রধান কোচ স্টিভ রোডসকে বিদায় করা ঠিক হয়েছে কি না?

খন্দকার জামিল উদ্দিন: স্টিভ রোডস চলে গেছেন। আমরা গণমাধ্যমের খবরে দেখেছি, তার সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কিছু ঝামেলাও ছিল বিসিবির। তবে আমি মনে করি, তাকে হয়তো আরো কিছুদিন রাখলে ভালো হতো। তাকে রেখে নতুন কোচ খোঁজার কাজ চালিয়ে যাওয়াটা ভালো হতো। কারণ, চাইলেই তো আপনি কোচ খুঁজে পাবেন না। কোচ পাওয়াটা কঠিন কাজ। সময়ের ব্যাপার। রোডসের সময় তো আমরা অনেক সাফল্য পেয়েছি।

আপনার চোখে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্স?

খন্দকার জামিল উদ্দিন: বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ভালো খেলেছে। কিন্তু আরেকটু ভালো করা দরকার ছিল। আমি মনে করি, বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় পেত তাহলে কিন্তু আমরা পঞ্চম অবস্থানে থাকতাম। ওই এক ম্যাচের কারণেই কিন্তু আমাদের পুরো টুর্নামেন্টের পারফররম্যান্সের চিত্রটা বদলে গেছে। ওই ম্যাচে জিতলে কিন্তু এটাই হতো আমাদের সেরা বিশ্বকাপ।

সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

খন্দকার জামিল উদ্দিন: আপনাকেও ধন্যবাদ।