বিশ্বকাপ ক্রিকেট শুরু হয়েছে ইংল্যান্ডে। সপ্তাহখানেক পর ঈদুল ফিতর। খেলা আর ধর্মীয় এ দুটি বড় উৎসব যেন স্পর্শ করছে না দেশের এক ঝাঁক নারী ক্রিকেটারকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অস্বচ্ছল ও গরীব পরিবার থেকে উঠে আসা এসব নারী ক্রিকেটার এবার খেলেছিলেন প্রিমিয়ার লিগে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের হয়ে।
কিন্তু ক্লাব থেকে পুরো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় লিগ শেষে ফিরেছেন মলীন মুখে। কারণ, চুক্তির অর্ধেক টাকা রেখেই তাদের ফিরতে হয়েছে ঘরে। সামনে ঈদ। বকেয়া টাকাগুলো পেলে বাড়তো তাদের ঈদ আনন্দ; কিন্তু পুরো পারিশ্রমিক না পাওয়ায় প্রিমিয়ারে খেলা এই মেয়েদের ঈদটাই মাটি হতে যাচ্ছে।

লায়লা, তৃষ্ণা, পায়েল, নাছিমা, রিদমি, শিরিন, লতা, ফারহানা, চম্পা চাকমা, পিংকিরা হাহুতাশ করছেন তাদের পাওনার জন্য; কিন্তু দল প্রিমিয়ার লিগ থেকে প্রথম বিভাগে অবনমিত হওয়ায় গুলশান ইয়ুথ ক্লাব অলিখিতভাবেই তাদের পারিশ্রমের একটা অংশ কেটে রেখেছে। পরিমাণটা কারো চুক্তির চল্লিশ ভাগ, কারো পঞ্চাশ ভাগের মতো।

গরীব আর অস্বচ্ছল পরিবার থেকে উঠে আসা অনেক মেয়ে তাদের সংসারের হাল ধরেন ক্রিকেট খেলার অর্থ দিয়ে। কিন্তু তারাই এখন লিগ শেষে চোখে সরষে ফুল দেখছেন। পুরো টাকা পাননি, এমনকি শেষ খেলার পর তাদের ক্যাম্পও দ্রুত বন্ধ করে দেয়া হয়। ক্লোজ করে দেয়া হয় ডাইনিংও। এসব কাহিনী বলতে গিয়ে আবেগটাও ধরে রাখতে পারছিলেন না কয়েকজন নারী ক্রিকেটার।

ময়মনসিংহের তাবাসসুম আরা রিতু লায়লার বাবা নেই। ঢাকায় মামার কাছে থাকেন। এবারের মহিলা প্রিমিয়ার লিগে মাত্র ১৫ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের সাথে। সব মিলিয়ে ৭ হাজার ৫০০ টাকা পেয়েছেন। বাকি টাকা আর পাবেন কিনা নিশ্চিত নন লায়লা।

\’লিগ শেষ হলে সর্বশেষ আমাকে ক্লাব দিয়েছে ১৬৫০ টাকা। সব মিলিয়ে পেয়েছি ৭৫০০ টাকা। বিদায় নেয়ার সময় ক্লাবের ম্যাডাম (গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের ক্রিকেট কমিটির কো-কনভেনার সাঈদা কবীর মুনমুন) বলেছেন, আমাদের চেয়ারম্যান দেশের বাইরে আছেন। তিনি ফিরলে বাকি টাকা দেয়ার বিষয়ে জানাবেন। আমি এবারই প্রথম এই ক্লাবে খেলেছি; কিন্তু আমাকে একটি ম্যাচও খেলতে দেয়া হয়নি। সব ম্যাচে আমি গরমের মধ্যে পানি টেনেছি। একদিন অসুস্থ হয়ে ওয়াশরুমে পড়ে গিয়েছিলাম। খুব কষ্টে আছি। বাকি টাকার ৪০ ভাগও যদি ঈদের আগে পেতাম, আমার অনেক কাজে আসতো\’- বলতে গিয়ে কন্ঠ ভারী হয়ে গেলো ময়মনসিংহের নারী ক্রিকেটার লায়লার।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তানিয়া আক্তার তৃষ্ণা এবারই প্রথম প্রিমিয়ারে নাম লিখিয়েছিলেন। গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন ২৫ হাজার টাকায়। পেয়েছেন ১৫ হাজার। \’এখন আমরা নানা কথা শুনি। পারফরম্যান্স খারাপ হওয়ায় আমাদের নাকি ৪০ পার্সেন্ট কেটে নেয়া হয়েছে; কিন্তু আমার প্রশ্ন- মাত্র একটি ম্যাচে খেলার সুযোগ পেয়েছি আমি। আমার পারফরম্যান্স মূল্যায়ন হবে কিভাবে? আমি তো খেলতে চেয়েছিলাম; কিন্তু সে সুযোগই পেলাম না\’- বলেন তানিয়া আক্তার তৃষ্ণা।

ঠাকুরগাঁয়ের রিমি আক্তার পায়েল ৪৫ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়ে পেয়েছেন ২৫ হাজার টাকা। ৯ ম্যাচের আটটিই খেলেছেন; কিন্তু পায়েল বুঝতে পারছেন না কেন তার বাকি ২০ হাজার টাকা দেয়া হচ্ছে না। কৃষিকাজ করা বাবার সংসারে তার মা ছাড়াও আছেন ছোট এক ভাই। ঈদের সময় তার পারিশ্রমিকের বাকি টাকাটা খুবই দরকার; কিন্তু তিনি অনিশ্চিত কবে তা পাবেন। কিংবা আদৌ পাবেন কিনা।



পাবনার নাছিমা আক্তারের ৩০ হাজার টাকা চুক্তি ছিল গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের সাথে। \’আমাকে মোট ১৬ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে ক্লাব থেকে বলেছে ৫০ ভাগ দিলাম। আমার বাবা নেই। বছর দুই আগে মারা গেছেন তিনি। ৫ ভাই-বোনের সংসার আমাদের চলে কষ্ট করেই। রুম ভাড়া করে থাকি। সামনে ঈদ। এ সময় টাকাগুলো পেলে অনেক উপকার হতো। না হলে তো ঈদই মাটি হয়ে যাবে\’- বলেন অলরাউন্ডার নাছিমা আক্তার।

নারায়নগঞ্জের রিদমি আক্তার বাবাকে হারিয়েছেন ১৮ বছর আগে। চাচা ও ভাইদের সঙ্গে থাকেন। গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের সঙ্গে তার চুক্তির পরিমাণ নিয়ে কোন কথা বলতে রাজি হননি। তবে তার সতীর্থদের কাছ থেকে জানা গেছে রিদমিও ক্লাবের কাছে পাবেন ২৫ হাজার টাকার মতো।

লেগ স্পিনার শিরিন আক্তারে বাড়ী কুষ্টিয়ার আবদালপুরে। যশোরের দড়াটানা এলাকায় ক্লেমন একাডেমিতে ক্রিকেট খেলা শিখেছেন। এ নিয়ে তৃতীয়বার তিনি মহিলা ক্রিকেট লিগে অংশ নিয়েছেন গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের হয়ে। তার সঙ্গে ক্লাবের চুক্তি ছিল ৭০হাজার টাকা।

\’আমি এ নিয়ে তৃতীয়বার এই ক্লাবে খেলেছি। গত মৌসুমে আমি চুক্তির শতভাগ পারিশ্রমিকই পেয়েছিলাম। তবে প্রথমবার ক্লাবটি এমন টালবাহানা করেছিল পারিশ্রমিক নিয়ে। এবার আমাকে প্রথমে ২০ হাজার ও পরে ১১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়েছে। খেলা শেষে ৭ হাজার ৭০০ টাকা দিতে চেয়েছিল। আমি নেইনি। বলেছি এক সঙ্গে দিয়েন। এখন ফোন দিলে ক্লাবের কেউ ধরেন না। আমি ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা পাবো। এক টাকাও কম নেবো না। প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নেবো\’- বলেছেন শিরিন আক্তার।

বছর চারেক আগে শিরিন পিতৃহারা হয়েছেন। একমাত্র বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। মায়ের সঙ্গে থাকেন শিরিন। \’আমার মা গরু-ছাগল পালন করে কোনোমতো কষ্ট করে সংসার চালান। সামনে ঈদ, টাকা না পেলে খুবই কষ্ট হবে আমাদের\’- শিরিন এভাবে বলেছেন তার অসহায় জীবনের কথা। পাশপাশি অনুরোধ করেছেন যাতে তার এই পাওনাটা পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

বরিশালের গৌরনদীর রাবেয়া বসরি লতা হতাশা নিয়ে জানালেন, \’আমার ঈদটাই মনে হয় মাটি হয়ে গেলো। ক্লাবের সঙ্গে আমার ২৫ হাজার টাকার চুক্তি হয়েছিল। দুইবারে দিয়েছে ১৩ হাজার টাকা। বাকি টাকা পাবো কিনা জানি না। খেলা শেষ হওয়ার পর ২ হাজার ৭০০ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে ক্লাব থেকে বলা হয়েছে তাদের সভাপতি দেশের বাইরে আছেন। তিনি ফিরলে দেখা যাবে। মনে হয় না তারা বাকি টাকাগুলো দেবে আমাকে। অথচ আশায় আশায় ছিলাম, এই টাকাগুলো পেলে আমি বাবা-মা ও ভাই-বোনদের জন্য ঈদে কিছু দেবো। তা আর হলো না।\’

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের নলডাঙ্গার পেস বোলার ফারহানা সুলতানা ৪০ হাজার টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের সঙ্গে। \’আমাকে তিন কিস্তিতে দিয়েছে ১৮ হাজার টাকা। আর লিগ শেষে বাড়ী ফেরার সময় সর্বশেষ পেয়েছি ৪ হাজার ৪০০ টাকা। তখন ক্লাব থেকে বলা হয়েছে ২০ পার্সেন্ট কেটে রাখলাম; কিন্তু কেন কাটবে তা জানি না। আমার বাবা-মা আছেন। আমরা দুই ভাই-বোন। বাবা কৃষি কাজ করেন। ঈদের আগে আমার টাকাটা খুবই দরকার। দল প্রিমিয়ার থেকে প্রথম বিভাগে নেমে গেছে সে অজুহাতে তো আমাদের টাকা কাটতে পারে না\’- বলছিলেন ফারহানা সুলতানা।

গুলশান ইয়ুথ ক্লাবে খেলা মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মুখ ছিলেন চম্পা চাকমা। রাঙ্গামাটির চম্পা এক সময় জাতীয় দলেও খেলেছেন। তার সঙ্গে ক্লাবের চুক্তি হয়েছিল ৮০ হাজার টাকায়। দিয়েছে ৪০ হাজার টাকা। এখনো ফিফটি পার্সেন্ট পারিশ্রমিক পাওনা তার।

\’লিগ শেষে ক্লাব থেকে জানিয়েছিল তাদের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি দেশের বাইরে আছেন। তারা ফিরলে কথা বলে জানাবেন বাকি টাকার বিষয়ে; কিন্তু কিছু জানায়নি। আমি ছাড়া বাকি মেয়েদের সামনে ঈদ। ওদের টাকা খুব দরকার। অথচ ক্লাব থেকে কিছুই বলছে না\’- বলেছেন চম্পা চাকমা।

খেলোয়াড়দের পাওনা প্রসঙ্গে ক্লাবটির ক্রিকেট সাব-কমিটির কনভেনার নিহার সিদ্দিকী বলেন, \’আমাদের দলে দুইজন ভারতীয় খেলোয়াড় ছিলেন। তাদের পারিশ্রমিক শতভাগ দেয়া হয়েছে। আর স্থানীয় খেলোয়াড় ছিলেন ১৫-১৬ জন। তাদের গড়ে ৬৫ ভাগ পারিশ্রমিক দিয়ে দেয়া হয়েছে। কেউ কেউ শতভাগও পেয়েছেন। আমরা দলের সুযোগ-সুবিধা প্রদানে কোনো কার্পণ্য করিনি; কিন্তু এবার আমাদের জঘন্য ফলাফল হয়েছে। দল এভাবে নেমে যাবে ভাবতেও পারিনি।\’

কিন্তু দল নেমে যাওয়ার কারণেই কী মেয়েদের পারিশ্রমিক শতভাগ দেয়া হয়নি? মেয়েদের বক্তব্যতো এমন কোনো শর্ত ছিল না। তাহলে সামনে ঈদে মেয়েদের টাকা পরিশোধ করা হচ্ছে না কেন? জবাবে নিহার সিদ্দিকী বলেন, \’আমাদের ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দেশের বাইরে আছেন। তারা ফিরলে বিষয়টি নিয়ে বসবো। আমরা টাকা দেবো না তাও কিন্তু বলিনি। তবে ৬৫ ভাগের নিচে কাউকেও দেয়া হয়নি। তমালিকা আমাদের সিনিয়র এক খেলোয়াড়, তাকে তো শতভাগ পারিশ্রমিকই দেয়া হয়েছে।\’

ঈদের আগে মেয়েদের পারিশ্রমিক পরিশোধের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে ক্লাবের এই কর্মকর্তা বলেন, \’ঈদের আগেই আমরা দিয়ে দিতাম; কিন্তু ওই যে বললাম সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বাইরে। তাছাড়া আমাদের খেলোয়াড়দের সঙ্গেও বসতে হবে। ওদের পারফরম্যান্সও মূল্যায়ন করা হবে। কেন দলের এমন খারাপ পারফরম্যান্স হলো?\’

গুলশান ইয়ুথ ক্লাবের ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, \’আমরা কাউকেই বলিনি কত পার্সেন্ট কেটে নেয়া হবে। তবে লিগ শুরুর আগে মেয়েদের এটা বলেছিলাম যে, পারফরম্যান্স দেখে টাকা দেবো। আমরা মেয়েদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছি; কিন্তু রেলিগেশন সেভটাও করতে পারলো না ওরা। ৯ ম্যাচের সবগুলোই হারলো। রেলিগেশন সেভ হলে আমি নিজের থেকে ওদের গিফট দিতাম। কিন্তু আমরা খুব কষ্ট পেয়েছি দল নেমে যাওয়ায়।\’

অভিযোগ আছে অনেক মেয়ের ৫০ ভাগ পারিশ্রমিক বাকি পড়ে আছে। তবে ক্লাবটির ক্রিকেট সাব-কমিটির কো-কনভেনার সাঈদা কবীর মুনমুন বলেছেন, \’ওরা অভিযোগ করছে মুখে। আর আমরা কথা বলবো কাগজ-কলমে। কে কতো টাকা নিয়েছে তা তাদের স্বাক্ষরসহ প্রমাণ আছে। আর বাকি টাকা নিতে হলো আমাদের সঙ্গে বসতে হবে। আমাদের সব সময় ইচ্ছা থাকে মেয়েরা যাতে না ঠকে; কিন্তু তাদেরও তো জবাবদিহীতা থাকতে হবে তাই না?\’

কয়েকজন মেয়ের অভিযোগ শেষ খেলার পর তারা ক্যাম্পে একদিনও থাকতে পারেনি। এমনকি ডাইনিং ক্লোজ হয়ে যাওয়ায় না খেয়ে ক্যাম্প ছাড়তে হয়েছে। এসব অভিযোগ অবশ্য উড়িয়ে দিয়েছেন সাঈদা কবীর মুনমুন, \’আমাদের শেষ ম্যাচ ছিল ১৯ মে। খেলা শেষ হওয়ার পরও ২ দিন আমরা মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সের রুম বরাদ্ধ রেখেছিলাম মেয়েদের জন্য। ২০ মে পর্যন্ত সকালের নাস্তার ব্যবস্থাও ছিল। তাই এসব অভিযোগ ঠিক নয়।\’ সূত্র:জাগো নিউজ