পায়ে বটি রেখে কাঠের ওপর সারাক্ষণ মাছ কাটেন। এই মাছ কাটতেই দিন শুরু হয়, মাছ কাটতে কাটতেই দিন কাটে। এতেই জীবন, এতেই সংসার।
কথা হচ্ছে রাজধানীর ফকিরাপুল ‍বাজারে মাছ কাটা পেশায় জড়িত কয়েকজনকে নিয়ে। তাদের পেশাই হলো মাছ কাটা।
দিনমান মাছ কেটে যা আয় হয়, তা দিয়ে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করান, গোটা মাস সংসার চালান স্বাচ্ছন্দ্যে। এদের কেউ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এ পেশায় আছেন। এমনও আছেন কেউ, যাদের দাদারাও এ পেশায় ছিলেন।
বাজারে আসা বেশির ভাগ মানুষই মাছ কিনে তাদের কাটতে দেন। বিনিময়ে কিছু টাকা নেন তারা। প্রতিদিন এভাবে মাছ কেটে প্রত্যেকে ৫০০-১০০০ টাকা আয় করে ঘরে নিয়ে যান। যাতে প্রত্যেকের আয় দাঁড়ায় সর্বসাকুল্যে ২০ হাজার টাকার মতো।
মাছ কাটা এই পেশাজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অনেকের বাপ ও দাদাও এ পেশায় জড়িত ছিলেন। বংশ পরম্পরায় পাওয়া এ পেশায় তারা এখন থাকলেও সন্তানদের যেন না ‍আসতে হয় সেই চেষ্টা করছেন। সেজন্য সন্তানদের পড়াশোনা করিয়ে মানুষ করতে ঘাম ঝরিয়ে চলছেন অবিরাম।
এমন একজন মিন্টু দাশ। ২২ বছর বয়সী মিন্টু এ পেশায় আছেন ১৬ বছর ধরে। প্রতিদিন সকাল ৭টার দিকে ফকিরাপুল মাছবাজারে আসেন তিনি। তার মতো এ বাজারে যারা মাছ কাটেন তারাও আসেন একইসময়ে। সবাই বাসায় যান দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে। মূলত এই কয়েকঘণ্টাই তাদের মাছ কাটার ব্যস্ততায় থাকতে হয়। বিকেলেটায় ততো ব্যস্ততা থাকে না।


মিন্টুর বাবা ধীরেন্দ্র দাশও এ পেশার সঙ্গেই জড়িত। তার পাশেই বসে এ বাজারে মাছ কাটেন বাবা।
মিন্টু জানান, মাছ কেটেই তার বাবা তাদের মানুষ করেছেন। তবে আগে মানুষ এতো বেশি মাছ কেটে নিতে চাইতো না। এ কারণে বাবার আয় তেমনটা হতো না।
বাসাবো কদমতলায় নিজের বাসায় বাবা, মা, স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে থাকেন মিন্টু। তার ভাইয়েরা অন্য পেশায় আছেন। মিন্টু দাশ নিজে পড়াশোনা না শিখতে পারলেও তার বড় ছেলেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করিয়েছেন স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে। স্বপ্ন দেখছেন, মানুষের মতো মানুষ হবে তার সন্তান।
মিন্টু জানান, ছোট, মাঝারি ও বড় তিন ধরনের মাছই কাটেন তারা। তবে মাছভেদে কাটার মূল্য নির্ধারণ হয়ে থাকে। ছোট মাছ হলে একটু বেশিই নেন। অন্যান্য বড় ও মাঝারি মাছ প্রতিকেজি ১০ এবং দুই কেজিতে ২০ টাকা নিয়ে থাকেন। এভাবে তাদের দৈনিক আয় হয় ৫০০-১০০০ টাকা পর্যন্ত।
মাছ কাটার পেশাটা খানিকটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ১৬ বছরে তেমন বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি মিন্টুর। একবার হাতের দুই আঙ্গুল কেটেছিল এবং তাতে ২২টি সেলাই দিতে হয়েছিল।
মিন্টু বাংলানিউজকে বলেন, সকাল থেকেই যা আয় করি তাতেই সংসার চলে। বিকেলে গিয়ে আর কোনো কাজ করতে ভাল লাগে না। আমরা যে ভুল করেছি, তা আমাদের সন্তানদের করতে দেবো না। তারা পড়ালেখা শিখে মানুষের মতো মানুষ হতে পারে, সেজন্য এখন ঘাম ঝরাচ্ছি।
মিন্টুর দাদাও এ পেশায় ছিলেন। তার দাদার হাত ধরেই বাবা ধীরেন্দ্র এ পেশায় যুক্ত হন। তারপর তিনিও এখন এ কাজ করছেন।
মিন্টুর মতো এ পেশায় আছেন রিপন দাশ, সুনীল দাশ, সাজু দাশ, চন্ডা দাশ, সুধীর দাশ। এদের সবার বাস রাজারবাগের হিন্দুপাড়ায়।
স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে রিপনের সংসার। এরমধ্যে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, এ পেশায় থেকেই।
মাছ কাটার এই পেশাজীবীরা প্রতিদিন পাঁচশ টাকা কামাই করলেও তাদের বাজারে বসতে চাঁদা দিতে হয় পঞ্চাশ টাকা করে।
রিপন জানান, বাজারে যারা ছোট, মাঝারি ও বড় মাছ কেনেন তাদের বেশির ভাগই মাছ কেটে নিয়ে যান। বাজারের পাশাপাশি কোনো হোটেলের বড় অনুষ্ঠান উপলক্ষেও তাদের মাছ কাটতে হয়।
হোটেল মালিকদের কাজ করলে তাদের মাছের মাথা দিয়ে দেওয়া হয়। সেই মাথা রিপনরা বিক্রি করে দেন প্রতিটি ৩০-৫০ টাকায়।

News Page Below Ad