বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করা হয়। আর এই সকল মামলার মধ্যে কয়েকটিতে তার সাজা দেওয়া হয়। তিনি প্রায় ২৪ মাসের বেশি সময় কারাগারে ছিলেন। তবে এরপর তাকে শর্ত সাপেক্ষে জামিন দেওয়া হয়। তাকে প্রথমে ছয় মাসের জামিন দেওয়া হয়। আর এই জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবারও তার জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। সেই জামিনের মেয়াদ শেষ হতে আর আর বাকি ১০৮ দিন। এ কারণে তার স্বজনরা চিন্তিত হয়ে পড়েছে।

সাময়িক মুক্তির শর্ত মেনে গুলশানের বাসা ফিরোজায় টানা ২৫৭ দিন কাটিয়ে দিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এক মুহূর্তের জন্যও তিনি বাসা থেকে বের হননি। দুই মেয়াদে ৬ মাস করে এক বছরের জন্য মুক্তি পেলেও এর মেয়াদ বাকি আর মাত্র ১০৮ দিন। মেয়াদ আর বৃদ্ধি করা না গেলে আবার তাকে চলে যেতে হবে কারাগারে। একদিকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে না পারা এবং অন্যদিকে মুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় খালেদা জিয়া ও তার স্বজনরা এখন চিন্তিত।

সাময়িক কারামুক্তির পর বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া যাতে বাসায় অবস্থান করেই যাবতীয় চিকিৎসা সেবা পেতে পারেন সে ব্যবস্থা আগেই করে রাখা হয়। তার মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শে গুলশানের বাসা ফিরোজা’য় হাসপাতালের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। এ জন্য খালেদা জিয়ার শয়নকক্ষের পাশের আরেকটি বড় কক্ষে তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় যন্ত্রপাতি বসানো হয়। তার বাসায় চিকিৎসক ও একান্ত আপনজন ছাড়া প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। তবে বিগত ২৫৭ দিনের মধ্যে মাত্র কয়েকবার বিএনপির ক’জন সিনিয়র নেতা ফিরোজায় প্রবেশ করে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কুশলবিনিময় করার সুযোগ পেয়েছেন। আরও অনেকে বাসায় যেতে চাইলেও খালেদা জিয়া তাদের অনুমতি দেননি।

মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই খালেদা জিয়া প্রায় প্রতিদিনই লন্ডনপ্রবাসী ছেলে তারেক রহমান, ছেলের বউ ডাঃ জোবাইদা রহমান, তারেক রহমানের মেয়ে জায়মা রহমান, প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান, তার দুই মেয়ে জাসিয়া রহমান ও জাহিয়া রহমানের সঙ্গে ফোনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কথা বলেন। এ সময় পরিবারের সদস্যরা খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর নেন। তাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে পেরে খালেদা জিয়া এখন স্বস্তিতে রয়েছেন।

দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর ২৫ মার্চ মুক্তি পেয়ে গুলশানের বাসা ফিরোজা’য় অবস্থান নিয়ে এখনও বাসার বাইরে যাননি বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। রাজনীতি থেকেও রয়েছেন বিরত। ঘনিষ্ঠ ক’জন স্বজন, চিকিৎসক ও দলের ক’জন নেতা ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে তিনি দেখা দেননি। এমনকি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসার চেষ্টাও করেননি। তাকে চিকিৎসা সহায়তা দিতে বাসায় সার্বক্ষণিকভাবে রয়েছেন একজন নার্স। যিনি লন্ডন প্রবাসী ডাঃ জোবাইদা রহমানের সঙ্গে কথা বলে খালেদা জিয়াকে নিয়মিত ওষুধ সেবন করান।

জানা যায়, মুক্তির পর নিজের বাসায় ২৫৭ দিন সময় কাটিয়ে স্বস্তিতেই রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। কিন্তু আর মাত্র ১০৮ দিন পর আবার কারাগারে যেতে হবে ভেবে মাঝে মাঝে তার মন খারাপ হয়। তবে স্বজনরা তাকে আস্বস্ত করছেন মুক্তির মেয়াদ আবারও বাড়ানোর চেষ্টার কথা বলে। যদিও আরেকবার মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো যাবে কি না সে নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না।

সূত্র জানায়, মুক্তি পাওয়ার পর গুলশানের বাসায় ২৫৭ দিন ভালভাবেই কাটে খালেদা জিয়ার। তিনি অসুস্থ হলেও বাসায় থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারার কারণে এখন স্বস্তিতেই আছেন। তবে শরীরিক অসুস্থতা ও মামলাজনিত কারণে আপাতত রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন না তিনি। স্বজনরা তাকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সম্ভব হয়নি। তবে বিদেশে যেতে হলে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে এমনটি মাথায় রেখেই খালেদা জিয়া রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন বলে জানা যায়।

৭৫ বছর বয়সে নিরিবিলি পরিবেশে একান্তে সার্বক্ষণিক নিজ বাসায় ২৫৭ দিন সময় কাটানো খালেদা জিয়ার জীবনের একটি অনন্য ঘটনা। এ সময় অসুস্থ খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার তেমন উন্নতি না হলেও নিয়মিত প্রিয় স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে পেরে তিনি এখন স্বস্তিতে আছেন। আপাতত তার শারীরিক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাসায়ই করা হয়। ডায়াবেটিসসহ তার শারীরিক অন্যান্য সমস্যাগুলোও স্থিতিশীল রয়েছে। ডায়াবেটিসের মাত্রা ১২ থেকে ১৪ এর মধ্যে উঠানামা করছে। দীর্ঘদিন ধরে রিউমেটিক আর্থ্রারাইটিস ও ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছেন তিনি। চলাফেরায় অন্যের সাহায্য নিতে হয়। তার জয়েন্টে জয়েন্টে যে ব্যথা তাও কমেনি। অন্যের সাহায্য ছাড়া খেতেও পারেন না।

সূত্র মতে, খালেদা জিয়ার মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শে ও লন্ডন প্রবাসী তারেক রহমানের ইচ্ছায় চিকিৎসার জন্য যা যা প্রয়োজন তা সংগ্রহ করে গুলশানের বাসাটাকেই অস্থায়ী হাসপাতালের আদলে গড়ে তোলা হয়েছে। গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর রোডের ১ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলায় তার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা হয়। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহের দায়িত্ব পালন করেন বিএনপিপন্থী চিকিৎসক সংগঠন ড্যাবের নেতারা। এ কাজ তদারকি করেন ড্যাবের সাবেক মহাসচিব ও বর্তমানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডাঃ জাহিদ হোসেন। তবে তিনি এ কাজ করতে গিয়ে তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডাঃ জোবায়দা রহমানের পরামর্শ নিচ্ছেন। ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শে নিয়মিত তার চিকিৎসা চলছে। এজন্য একজন ডাক্তার ও একজন নার্স সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিদিনই তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করানো হচ্ছে।

জানা যায়, চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ সেবন করায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার ডায়াবেটিসের মাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এছাড়া তার স্বাস্থ্যের সার্বিক অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা ভাল রয়েছে। বাসায় অবস্থান করার পর মানসিকভাবে স্বস্তিতে থাকায় সবদিক থেকেই তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে না পারার বিষয়টি তাকে কিছুটা পীড়া দিয়েছে।

সূত্র জানায়, কাজের মেয়ে ফাতেমা ও চিকিৎসকদের খালেদা জিয়ার কক্ষে যেতে হলে পাশের আরেকটি কক্ষে জীবাণুনাশক ব্যবহারসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক পরতে হচ্ছে। এছাড়া সমগ্র বাসাটির ওপর ও নীচতলায় প্রতিদিন জীবাণুনাশক ছিটিয়ে জীবাণুমুক্ত রাখা হচ্ছে। সাময়িক মুক্তি পেয়ে গুলশানের বাসায় অবস্থান করার পর থেকেই খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সার্বিক তদারকি করছেন লন্ডন প্রবাসী পুত্রবধূ ডাঃ জোবাইদা রহমান। মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চললেও লন্ডন থেকে ডাঃ জোবাইদা রহমানই খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়টি সমন্বয় করছেন। তিনি খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয় নিয়ে মাঝেমধ্যে লন্ডনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদেরও পরামর্শ নেন।
সূত্র: জনকণ্ঠ

এদিকে, বিএনপি নেত্রীড় উন্নত চিকিৎসার কথা বলে আসছে তার পরিবার ও দল। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে তিনি কোথাও বের হতে পারছেন না। একই সাথে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো রকম সবুজ সংকেত দেওয়া হচ্ছে না। এর মধ্যে তার দ্বিতীয় দফার জামিনের মেয়াদও শেষের দিকে। এ কারণে বর্তমানে তার পরিবার অনেক চিন্তিত রয়েছেন। তার পরিবার কোনো ভাবেই তাকে আর কারাগারে যেতে দিতে রাজি নয়।