একটি দেশের উন্নতির প্রথম সোপান হিসেবে ধরা হয় সে দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা কেমন তার উপর। সে দিকটাকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশ সরকার দেশের সমগ্র রাস্তা ঘাট উন্নয়য়নের দিকে নজর দিয়েছে যা বর্তমান সময়ে একটি লক্ষনীয় একটি বিষয়। এরই প্রেক্ষিতে যাত্রী পরিবহন, পণ্য পরিবহন প্রশিক্ষণের দ্বারা সড়ক পরিবহন খাতে দক্ষ থেকে দক্ষতর জনশক্তি তৈরী ও সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা এবং বিষয়টি নিয়ন্ত্রনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) বেশ জোরেশোরে কাজ শুরু করেছে।
দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে মোট ৯ শত ৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষে সমগ্রদেশে ৩ লক্ষ ভারী যানবাহন চালকদের উন্নত প্রশিক্ষনের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করানো হবে। কিন্ত অনেকটা অবাক করা বিষয়টি হলো এ প্রকল্পের খোরাকি খরচ খাত যেখানে খরচ ধরা হয়েছে ৩৮৪ কোটি টাকা। স্বাভাবিকভাবে প্রকল্পটির প্রধান কাজ হলো প্রশিক্ষণ এবং সেখানে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৫ কোটি টাকা। তাহলে, দেখা যাচ্ছে প্রশিক্ষণের ব্যয়ের চেয়ে খোরাকি খরচের পরিমান ২৫৯ কোটি টাকা বেশি।

চালক তৈরির প্রকল্পে খোরাকি খরচ বেশি হওয়ায় এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। চলতি সময় থেকে ২০২৫ সালের জুন মেয়াদে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি প্রকল্পটি নিয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটিড় (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগে। সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন খাতবাবদ প্রস্তাবিত ব্যয় যৌক্তিক করা প্রয়োজন বলে মত দেয় পরিকল্পনা কমিশন।

সভায় পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ প্রধানের সভাপতিত্বে সড়ক পরিবহন উইং, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি), বিআরটিসি, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) ও আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের (এএফডি) প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে প্রকল্পের ব্যয় যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের বিষয়ে একমত পোষণ করা হয়

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের এক কর্মকর্তা বাংলানিউজকে বলেন, এ প্রকল্পের খোরাকি খরচ কমানো হবে। একই সঙ্গে পোশাকের খরচও কমানো হবে। এ বিষয়ে আমরা একটা কমিটি গঠন করেছি। সংশ্লিষ্ট বিভাগকেও বলেছি যে, ব্যয় যৌক্তিক করতে হবে।

বিআরটিসি সূত্র জানায়, ৩ লাখ চালক তৈরির খাতে ৩৮৪ কোটি টাকা খোরাকি খরচ ধরা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দৈনিক একজন চালককে ৩০০ টাকা খাওয়া ও ৫০০ টাকা হাত খরচ দিতে হবে, এটি খোরাকি খরচের মধ্যে রয়েছে। সব মিলিয়ে ৩ লাখ ভারী যানবাহন চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ৩৮৪ কোটি টাকার খোরাকি ভাতা দেওয়া হবে। এছাড়া ১৫ কোটি টাকার পোশাক ভাতা দেওয়া হবে। প্রশিক্ষণের জন্য ১২৫ কোটি টাকার প্রশিক্ষণ ভাতার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত ৫০টি ড্রাইভিং সিমুলেটর কেনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিআরটিসির জন্য ২১টি এবং এএফডির জন্য ১২টিসহ মোট ৩৩টি ড্রাইভিং সিমুলেটর কেনা হবে।

চালকদের প্রশিক্ষণের সময়সীমা ২ সপ্তাহ ও ৪ সপ্তাহ। যারা হাল্কা যানবাহনের লাইন্সে দিয়ে ভারী গাড়ি চালাচ্ছেন তাদের ২ সপ্তাহ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যাদের হাল্কা যানবাহনের লাইসেন্স আছে, হাল্কা যানবাহন চালাচ্ছেন কিন্তু ভারী গাড়ি চালাতে ইচ্ছুক তাদের ৪ সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। এর জন্য ৬১টি জেলায় ১৬৪টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকবে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে জেলায় জেলায় প্রশিক্ষণপ্রার্থীদের নির্বাচিত করা হবে। ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিতে কোনো ধরনের টাকাপয়সা নেওয়া হবে না। উল্টো ড্রাইভিং শিখতে এলে দৈনিক ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। কোনো খরচ ছাড়াই ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হবে।

’এ প্রকল্পের আওতায় প্রতি বছর ন্যূনতম ৬০ হাজার দক্ষ চালক তৈরি করা হবে। এর ফলে মানব সম্পদের উন্নয়ন, যানবাহন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা যাবে। সাশ্রয়ী ভাড়া, আরামদায়ক, আধুনিক ও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা, সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার মাধ্যমে সঠিক সেবা দেওয়াও অন্যতম উদ্দেশ্য। অথচ খোরাকি খরচ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।’

৩৮৪ কোটি টাকা খোরাকি খরচ ধরা প্রসঙ্গে বিআরটিসির ম্যানেজার (প্ল্যানিং) আবু বকর সিদ্দিক গনমাধ্যমকে বলেন, বাজেট এখনও ঠিক হয়নি। প্রকল্পটি নিয়ে একটা পিইসি সভা হয়েছে। আমরা সবকিছু নিয়ে একটা হিসাবনিকাশ করছি। খোরাকি খরচের মধ্যে দৈনিক খাওয়া বাবদ ৩০০ টাকা ও হাতখরচা ৫০০ টাকা দেওয়া হবে। একজন চালক সব কাজ ফেলে রেখে সারাদিন প্রশিক্ষণ নেবেন, ফলে এর থেকে কম টাকা দেওয়া যায় না। তারপরও প্রকল্পটি নিয়ে ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ চলছে।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বাস ও ট্রাকসহ মোট দুই লাখ ৫০ হাজার ৮০৩টি ভারী যানবাহন রয়েছে। এসব যানবাহনের মধ্যে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৭৭৩টিতে বৈধ চালক রয়েছে। অর্থাৎ ৬৭ হাজার ৩০টি বাস ও ট্রাকের স্টিয়ারিং অবৈধ চালকের হাতে। ভারী লাইসেন্স না থাকলেও তারা দিব্যি গাড়ি চালাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টরা সূত্র মতে, বর্তমান সময়ে সড়কে ব্যবহৃত এই ৬৭ হাজার ভারী যানবাহন এখন বিপদে রয়েছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে এ সকল যানবাহন যদি দক্ষ, প্রশিক্ষিত এবং লাইসেন্সকৃত চালকদের নিকট না দেওয়া হয় তবে সড়ক দুর্ঘটনা ক্রমান্বয়ে বাড়তে পারে। প্রতিটি যানবাহনে যদি কমপক্ষে একজন করে দক্ষ চালকও থাকে তারপরও এ সমস্ত ভারী যানবাহন চালক হিসেবে দেশে চালকের ঘাটতিতে দেখা যাবে ৬৭ হাজার ৩০ জনেরও বেশি রয়েছে।

বিআরটিএ এর তথ্য মতে, প্রত্যেকটি ভারী যানবাহন চালানোর জন্য আমাদের দেশে গড়ে দেড়জন চালক প্রয়োজন। এদিকে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সমিতির মতে ভারী যানবাহন চালানোর সময় ঐ পরিবহনে কমপক্ষে দুইজন করে চালক থাকা দরকার। কিন্তু হিসাব করলে দেখা যায় যে সকল ভারী যানবাহন রাস্তায় চলমান আছে সে সকল যানবাহন জন্য আরও ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬০ জন চালকের প্রয়োজন। কীভাবে এই ঘাটতি কমানো যাবে তা এখনই সরকারের নজর দেয়া উচিৎ বলে মনে করছে এই পরিবহন মালিক শ্রমিক সমিতি।