বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শতভাগ ও নব্বইভাগ কমিশনে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটের টিকিট পেয়ে থাকেন। এভাবে একজন কর্মকর্তা নিয়েছেন ৮৭টি টিকিট। আরেকজন নিয়েছেন ৬৮টি। অন্য একজন নিয়েছেন ৫০টি টিকিট। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজ ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে এভাবে গত ১০ বছরে প্রায় ৪৫ হাজার টিকিট নিয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। এ কারণে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমানের শত শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সরকারও বঞ্চিত হয়েছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে। এ অবস্থার লাগাম টেনে ধরতে চাইছে সরকার। এ নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
শতভাগ কমিশনে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টিকিট নিতে পারেন কি না সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে গতকাল সোমবার মন্ত্রণালয় থেকে বিমানের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা রয়েছে কি না ও কমিশনে কত টিকিট নেওয়া হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান দিতে বলা হয়েছে।

সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভায় আলোচনা হয়েছে। কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী কমিশনে কতগুলো টিকিট নিয়েছেন তার পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয় সভায়। এ পরিসংখ্যান দেখে সংসদীয় কমিটির সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় কমিটি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মহিবুল হক গতকাল বলেন, বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে এসেছে। কমিশনের মাধ্যমে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টিকিট নিতে পারেন কি না সে বিষয়ে জানতে চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিমানকে নীতিমালা সংশোধন করতে বলা হবে। এভাবে কমিশনে টিকিট নেওয়া হলে রাষ্ট্রীয় এ সংস্থাটি অবশ্যই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তিনি বলেন, বিমানকে লাভজনক করতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এজন্য যা যা করণীয় সরকার তাই করবে। অনলাইনে টিকিটিং ব্যবস্থা, সেবার মান উন্নয়ন, যাত্রী সাধারণের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী বিমানের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

কার নামে কত টিকিট :মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় কমিটির নথি সূত্রে জানা গেছে, কেনাকাটা ও কৌশলগত সহায়তা পরিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজ নামের পাশাপাশি স্ত্রী-পরিজনের নামে গত দশ বছরে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটের ৪৬টি টিকিট নিয়েছেন। ১৩টি টিকিট নিয়েছেন ওই বিভাগের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) সরোয়ার হোসেন। সিনিয়র সাইন রাইটার মোহাম্মদ মহসীন নিয়েছেন ২২টি টিকিট।

কেনাকাটা বিভাগের সহব্যবস্থাপক স্বপন কুমার দে নিজে ও পরিবার-পরিজনের নামে শতভাগ কমিশনে ৬৮টি টিকিট নিয়েছেন। সহব্যবস্থাপক নুরুজ্জামান ১২টি, প্রশাসনিক কর্মকর্তা রোকসানা আক্তার ১৮টি, প্রশাসনিক সহকারী দিলরুবা আফরোজা ২৬টি টিকিট নিয়েছেন। এই বিভাগের অন্য কর্মচারীদের মধ্যে আবুল হাসেম ১৭টি, একেএম মাহফুজুর রহমান ১৪টি, মানিকুর রহমান ২টি, লামিয়া শারমিন ৫০টি টিকিট নিয়েছেন। নিজাম উদ্দিন ৮টি, ফকির আবদুল হালিম ৮টি, আবদুল খালেক ১৪টি, আলমগীর কবির ১৮টি, আবু তালেব ১৭টি, ইষ্টার হালদার ২২টি, সাইফ উদ্দিন ১৬টি, আবদুর রশীদ ১৩টি, ফরহাদুর রেজা ১৮টি, মাছুদুল আলম খান ৬টি, শরীফুল ইসলাম ১৩টি, শরিফ হাসান ১৩টি, হাবিবা মির্জা ২০টি, নেছার আলী গাজী ৪৬টি, জাহাঙ্গির আলম তোকদার ২০টি, রবিউল ইসলাম ২০টি, মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন ৪টি এবং মতিউর রহমান ৪টি টিকিট নিয়েছেন।

এছাড়াও প্রশাসন পরিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে আল মাসুদ খান ও কামাল হোসেন ১৮টি, ফখরুল আলম চৌধুরী ২৯টি টিকিট নিয়েছেন। এর প্রতিটি টিকিটে ৯৫ শতাংশ কমিশন ধরা হয়েছে। এ শাখার ৪২ কর্মকর্তার সবাই টিকিট নিয়েছেন ৯০ থেকে ১০০ ভাগ কমিশনে। আইটি বিভাগের উপব্যবস্থাপক সৈয়দ মোস্তাক হোসেন আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে নিজ পরিবারের নামে ৩৩টি টিকিট নিয়েছেন ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ কমিশনে। সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট আরিফুল হাসান ৮৭টি টিকিট, নার্গিস আক্তার ৮৫ শতাংশ সুবিধায় ৪৩টি টিকিট নিয়েছেন।

এভাবে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে কমিশনে টিকিট নেওয়ায় সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে কয়েকশ’ কোটি টাকা। আগামীতে এসব কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করতে সম্প্রতি বিমান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করেছে। এ ধরনের সুবিধা বন্ধ করতে মন্ত্রণালয়কে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়।

এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ক্যাপ্টেন ফারহাত হাসান জামিল বলেন, চাকরির প্রকারভেদে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কমিশনে টিকিট পেয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। তবে কমিশনের টিকিট হলেও তাদের ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। কমিশনে টিকিট নেওয়া নীতিমালা সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে মন্ত্রণালয়ের চিঠি এখনও তাদের কাছে পৌঁছায়নি বলে জানান তিনি।