পাকিস্তানকে যদি গনায় না ধরি, তবে মানসিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে হতদরিদ্র দেশটার নাম বাংলাদেশ। সবচেয়ে সেক্সিস্ট, মেয়েদের ব্যাপারে সবচেয়ে কূপমণ্ডুক আর মেয়েদের শরীর নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের উগ্রবাদী দেশটা বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মেয়েদের পোশাক, চলাফেরা নিয়ে জঘন্য রকম চিন্তিত, ভাবিত, রক্ষণশীল, প্রতিক্রিয়াশীল আর মন্তব্য প্রদানকারী মানুষ বাংলাদেশ ছাড়া এই দক্ষিণ এশিয়ার আর কোন দেশে নাই। পাকিস্তানের কথা আলোচনাতেই আনতে চাই না। কারণ কোন দিক থেকেই পাকিস্তানকে আমি কোন রাষ্ট্রের পর্যায়েই ফেলি না। এটি একটি আপাদমস্তক ব্যর্থ, নামে মাত্র স্বাধীন একটা দেশ।  একাত্তরের গণধর্ষক এই দেশের নারীদের স্বাধীনতা, সম্মান নিয়ে কথা বলে অযথা সময় নষ্ট করতে চাই না।
আমি জানি, আমার লেখা পড়েই ভারতে নির্মলা ধর্ষণ থেকে শুরু করে বহু ধর্ষণের ইতিহাস তুলে ধরে আমাকে তুলোধুনা করবেন বহু মানুষ। আমি আগাম তাদের কথা মেনে নিয়েই বলছি, হ্যাঁ, ভারতের পরিস্থিতিও অত্যন্ত খারাপ। সেখানে ধর্ষণ হচ্ছে বেশুমার। কিন্তু তাই বলে আমরা বলতে পারি না যে বাংলাদেশে ভারতের চেয়ে ধর্ষণের ঘটনা কোন অংশে কম ঘটছে।  আর শারীরিক এইসব ধর্ষণের পাশাপাশি মানসিক ধর্ষণ, চক্ষু দিয়ে ধর্ষণ, কথা দিয়ে, বক্তব্য দিয়ে, কোনো কোনো ওয়াজ মাহফিল দিয়ে, ইভ টিজিং দিয়ে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে, নিয়মকানুন, রীতিনীতি দিয়ে প্রতিনিয়ত মেয়েদের যে সীমাহীন ধর্ষণ পীড়ন এই দেশে চলে, দক্ষিণ এশিয়ার আর কোন দেশ নারী অবদমনের প্রতিযোগিতায় তার এই জায়গা দখল করতে পারবে না। বিশেষত পোশাকের ব্যাপারে বাংলাদেশের নারীসমাজকে যে পরিমান কটু কথা শুনতে আর রীতি মেনে চলতে হয়, তা এই দেশের মেয়ে মাত্রই জানেন।   
আমাদের দেশে মেয়েদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ওড়না। মেয়ে জন্মানোর সাথে সাথে এই ওড়নাখানাও জন্মায়। সে অপেক্ষায় থাকে। মেয়ের হাত পা শরীর মন বিকশিত হবার আগেই ওড়না এসে তার উপড়ে ঝাপ দিয়া পড়ে। কারণ মেয়ের ‘বুক গজিয়েছে’। সোশ্যাল মিডিয়ায় বহুল আলোচিত সাজু খাদেম নামের লোকটার মত মানুষের ভাষায় ‘দুধ’ গজিয়েছে। তো এই বুকখানা উঁকি দেবামাত্র হৈ হৈ রৈ রৈ পড়ে যায়। বাড়িতে পাড়ায় আত্মীয়মহলে। মা ছুটে এসে ওড়নাখানা জড়িয়ে দেয় মেয়ের গায়ে। স্কুলের ইউনিফর্মেও যুক্ত হয়ে যায় ওড়না। এদিকে মেয়ে হয়তো স্তনের বিকাশ প্রকাশ কার্যকারিতা কিছুই তখনো বোঝেনা। যৌনজীবন নিয়েও তার কোন জ্ঞানবুদ্ধি নেই। কারণ পরিবার বা স্কুল-সর্বত্রই এই যৌনশিক্ষার বিষয়টা সযতনে এড়িয়ে, সরিয়ে, রেখে ঢেকে ছেলে মেয়ে বড় করে তোলা হয়। এই সমাজের ধারণা, যৌনশিক্ষা না থাকলে কী হবে, ওড়না আছে। এই ওড়নাই এই সমাজের চোখে আসল জিনিস। এই ওড়না হলো মেয়ের ইজ্জত, সম্মান, মর্যাদা আর কী কী সব।  
আমাদের সমাজের মুরুব্বিদের মতে, মেয়ে ঠিক থাকলেই সমাজ ঠিক। এই কারণেই ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে’ এই টাইপের সেক্সিস্ট তৃতীয় শ্রেণির প্রবাদ প্রবচনের জন্ম হয়। সেগুলো বহুল ব্যবহৃত হয়। আর মেয়ের বুকে ওড়না জড়িয়ে এদেশের পুরুষের যৌনাঙ্গ আর যৌনচেতনাকে অসুস্থ অবাধ স্বাধীনতা দিয়ে রাখা হয়। অন্যদিকে সমানতালে চলে অবদমিত কামের বন্দনা। ধর্ম, সমাজ, বাঙালি মূল্যবোধ- এধরনের খোড়া, নানাভাবে ত্রুটিযুক্ত কিছু বস্তুকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনায় রেখে এমন একটি সমাজকাঠামো গড়ে তুলে তা বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়, যা মেয়েদেরকেই নানা রকম শৃঙ্খলে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে মরিয়ে রেখে চিপে চেপে পিষে মারে। এই রকম একটা জগাখিচুরি পরিস্থিতিতে মেয়ের বেছে নেবার, হাত পা খুলে মেলে চলার, হাঁটার কোন স্বাধীনতা নাই। আড়াই গজি কাপড়ের একটা ওড়না সামলানোই যদি হয় তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর অন্যতম, তবে সে আর খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিতে শিখবে কি?  
নেপালে থাকি। গরীব একটা দেশ। তেরো চৌদ্দ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। ভূমিকম্পের পর পাহাড়ী দেশটার মানুষগুলো প্রাণপণ চেষ্টা করছে ঘুরে দাঁড়ানোর। পুরুষের সাথে সমান তালে কাজ করছে মেয়েরা। ইট ভাঙা থেকে শুরু করে মুদি দোকান, আসবাবপত্র, কাপড়, জুতার দোকান সবখানে মেয়েরাই কাজে এগিয়ে। কাঠমান্ডুর বেশিরভাগ স্থানেই মেয়ে ট্রাফিক পুলিশ। আর ব্যাংক বীমা অফিসে তো মেয়েরা আছেই। আর পোশাক? যার যা সুবিধা তাই পরছে। শাড়ি সালোয়ার কামিজ থেকে শুরু করে খাটো হট প্যান্ট, মিনি স্কার্ট, টপলেস ফ্রক, বিকিনি- কী না! এইসব পরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মেয়েরা। কখনও দেখিনি কোন পুরুষ কি আর কেউ হা করে তাকিয়ে আছে সেদিকে। কারো ভ্রুক্ষেপ নেই মেয়েদের পোশাকের দিকে। যার যা ইচ্ছে পরছে, যেভাবে ইচ্ছে চলছে ফিরছে। যদি পোশাক হত মেয়েদের ‘ইজ্জতের রক্ষাকবজ’ তবে, নেপালে প্রতি ঘণ্টায় একশটা ধর্ষণ হবার কথা!
ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপেও একই চিত্র। মালদ্বীপ মুসলিমপ্রধান দেশ হলেও মানুষের নোংরা উক্তি, কটাক্ষ মেয়েদেরকে ক্ষতবিক্ষত করে না। দ্বীপগুলোকে কেন্দ্র করে যে পর্যটন রিসোর্টগুলো গড়ে উঠেছে, তাতে মেয়েদের পোশাক ও চলাফেরায় কোন বিধি নিষেধ নাই। ভারতের কলকাতায় বহু রাত পর্যন্ত মেয়েদের পথে হাঁটতে দেখেছি। পোশাকেও কোন রক্ষণশীলতা চোখে পড়েনি। যার ইচ্ছে শাড়ি পরছে, যার ইচ্ছে মিনি। কেউ খেয়ালও করছে না। ভারতে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, ইভ টিজিংয়ের ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু মেয়েরাও চুপ করে বসে নেই। চলায় ফেরায় পোশাকে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে শিখছে। সেখানে অন্তত ওড়নাখানা গলায় নাকি, বুকের ওপরে ঠিক জায়গায় আছে, তা নিয়ে মেয়েদের ব্যতিব্যস্ত থাকতে দেখিনি। আমি অবশ্য কোলকাতায় ওড়না পরা মেয়েই দেখেছি হাতে গোনা। মেয়েরা অধিকাংশই কুর্তা পরে। সাথে প্যান্ট বা লেগিনস।
প্রতিবেশি দেশগুলোর অবস্থা যখন এই, আমরা এখনো ওড়না সাইডে নাকি বুকের উপড়ে নাকি গলায়, সেই নিয়ে ফেসবুকে পেজ খুলি। মেয়েদের অকথ্য ভাষায় টিজ করি। প্রকাশ্যে, রাস্তাঘাটে, হাটেবাজারে, ইন্টারনেটে, কোথায় না? আত্মীয়স্বজন কূটকচালি করে, বন্ধুবেশি বন্ধুরা কানাঘুষা করে, সহকর্মীরা সমালোচনায় মুখর হয়! কারণ কি? কারণ মেয়ের সেই ওড়না। সেই মহার্ঘ্য বস্ত্রখণ্ড, যা দিয়ে মাপা হয় নারীর চরিত্র, নারীর সতীত্ব। যা এখন রাষ্ট্রযন্ত্রেরও মাথাব্যথার বিষয়। ক্লাস ওয়ানের পাঠ্যবইয়ে তাই ও তে ওড়না চাই। ক্লাস ওয়ানের পাঁচ কি ছয় বছরের শিশু কন্যার মাথায়, মগজে, মননে, অস্তিত্বে, চেতনায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে পাকাপাকিভাবে ওড়নাচেতনা ঢুকিয়ে দেবার এই ‘মহান উদ্যোগ’ আমাকে বিস্মিত করে না। বেদনাহতও না। করে আতংকিত।
এ কোন সমাজ, কোন আদিম রক্ষণশীলতার যুগে ঢুকে পড়ছি আমরা? নারী ওড়না পরবে কি পরবে না, কামিজ না স্কার্ট, শাড়ি না প্যান্ট তা এতদিন নির্ধারণ করে দিত প্রাগৈতিহাসিক মানসিকতাধারী এই সমাজ। আর এখন তাকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও দেয়া হচ্ছে। ক্লাস ওয়ানের মেয়ে শিশুটিই শুধু নয়, ছেলে শিশুটির মাথায়ও গেঁথে দেয়া হচ্ছে ওড়না চেতনা। সে একেবারে শিশুকাল থেকে জানছে, বইতেও লেখা আছে ওড়না আবশ্যক। অতএব কোন নারীকে যদি সে ওড়না ছাড়া দেখে, তবে সে ন্যায় অন্যায়ের মাপকাঠিতে তাকে মাপতে শিখে নেবে। শিক্ষাব্যবস্থা তাকে উৎসাহ যোগাবে আরো আদিম, আরো সেক্সিস্ট, আরো কূপমণ্ডুক হয়ে উঠতে। যে কূপমণ্ডুকতা তাকে নারীর পোশাক নিয়ে চিন্তা আর দুশ্চিন্তায় আচ্ছন্ন, যৌনকাতর রাখে।
সবচেয়ে নিকট প্রতিবেশি এবং অর্থনীতি, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মিল থাকার কারণে আজ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেশের মেয়েদের প্রতি পোশাককেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা ও আচরণ নিয়ে কথা বললাম। উন্নত দেশের সাথে তুলনা দূর অস্ত। নেপালে, শ্রীলঙ্কায়, ভুটানে ছোট্ট পোশাকটি পরে অবলীলায় ঢুকে পরেছি গ্রাম বা মফস্বলের কোন দামি বা কমদামি রেস্টুরেন্টে। শিক্ষিত অশিক্ষিত, ধনী দরিদ্র, নারী পুরুষ, শিশু কেউ ফিরেও তাকায়নি আমার পোশাক অথবা আমার দিকে। অথচ সেই একই পোশাকের ছবিটি যখন হয়ে উঠেছে আমার ফেসবুক প্রোফাইল ফটো, তখন আমার খোলা পা, খোলা হাত, ওড়নাহীন টপস- প্রাকৃতিক নৈসর্গের চেয়ে বেশি আলোচিত সমালোচিত হয়েছে বাঙালি নারীপুরুষের চোখে। হায় রে বাঙালি! নারীর হাত পা মুখ পেট বুক সবই তাদের কাছে যৌনবস্তু। তা সে যারই হোক, যে ভাবেই হোক, যে পরিস্থিতিতেই হোক। এই বাঙালি নারীকে বস্ত্রে জড়ায় ধর্মের দোহাই দিয়ে, সামাজিক মূল্যবোধের ঝাণ্ডাতুলে ধরে। কিন্তু নিজের চোখের আব্রু, আচরণের শালীনতায় সে কোন বাঁধ দিতে রাজি নয়। যদিও ধর্ম তাকে সেই শালীনতার কথাও পই পই করে বলে দিয়েছে। কিন্তু বাঙালির ধর্মবোধ তো সেই সুবিধাবাদীর বোধ যা পুরুষতন্ত্রকে নাইয়ে খাইয়ে কোলে তুলে নারীর চিরদাসত্বের পথটিকে আরো পাকাপোক্ত করবে। আর সেখানে নারীর হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। তার শরীরে সে কোন বস্ত্র জড়াবে তা বলে দেবে তার মালিক ওই পুরুষই।
যুগের পর যুগ ধরে সৌন্দর্যের নামে নারীকে নানারকম অলংকার আর বস্ত্রখণ্ডে বেঁধে রেখে সুকৌশলে তাকে খাঁচায় ধরে রাখাই ছিল পুরুষতন্ত্রের রীতি। পায়ের ঘুঙুর পরে হাঁটতো মেয়ে আর পুরুষতন্ত্র তার গতিবিধির খবর রাখতে পারত সহজেই। কপালে সিঁদুর টিপ, শাঁখা, পলা পরিয়ে কিনে নেয়া প্রাণির চিহ্ন ধারণ করতো নারীই।  বোরকা, হিজাবে নারীকে জড়িয়ে রেখে তার চলাচলের পথ সীমিত করার প্রয়াস ধর্মের নামে পুরুষতন্ত্রেরই। ধর্মের নামে, সামাজিক মূল্যবোধের নামে আজো পুরুষতন্ত্র নানান রীতিনীতি ফাঁদে আটকে রাখে নারীকে।  ওড়না নামের আড়াই গজি কাপড়ের বাধ্যবাধকতা, পোশাক দিয়ে নারীর চরিত্র যাচাই- এই সবই আধুনিক প্রগতিশীলতার ভিতরে ভিতরে প্রবাহিত পুরুষতন্ত্রের গলিত ক্লেদ। এই ক্লেদে পা জড়ায় না, এই দেশে এমন কোন মেয়ে নেই। আজ সেই ওড়নাখানাই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বাঙালির মসনদে ঢুকে পড়েছে। আজ রাষ্ট্রই তার নারী পুরুষ সবাইকে শেখাবে ওড়না ছাড়া নারী- নারী নয়! হায়! একটি আড়াই গজি তুচ্ছ কাপড়ে ততোধিক তুচ্ছ নশ্বর শরীর ঢেকে রাখার প্রক্রিয়ায় যে জাতির তাবৎ নারীকূলের মর্যাদা আর চরিত্র নির্ণিত হয়, সেই অথর্ব জাতির মুক্তির স্বপ্ন যদি কেউ কখনো দেখেও থাকেন, জেনে রাইখেন সেও এক বিরাট বাতুলতা!
লেখক : প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা ।

সূত্র:jagonews24

News Page Below Ad