মো. মুখলেছুর রহমান, ঢাকা: আমাদের দেশের কিছু কিছু ওয়াজ মাহফিল দেখলে মনে হয়, তা যেন মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের সময়কার অনুরূপ। তখন মানুষের কাছে বিনোদনের মাধ্যম হয়ে উঠেছিল ঘোড় দৌড়, ছড়া, কবিতা আবৃত্তি ও গানের অনুষ্ঠান, মল্লযুদ্ধ, বিতর্কসভা এবং বিনোদনমূলক ওয়াজ ইত্যাদি।
মানুষজন ব্যস্ত ছিলেন এগুলো নিয়েই। কার আয়োজন বেশি আড়ম্বরপূর্ণ ও বর্ণাঢ্য হবে- সে নিয়েই হতো প্রতিযোগিতা। ওয়াজ মাহফিলগুলোতে এক পক্ষ অপর পক্ষের নিন্দা করতেন, করতেন কঠোর অশোভন সমালোচনা। কখনো কখনো করতেন গালাগালিও। অপর দিকে পর্তুগিজ আর মারাঠারা দখল করে নিচ্ছিল দেশ।
সেকালের হাতে গোনা কিছু সচেতন আলেম দ্বীনের নামে চলমান এসব প্রথার সমালোচনা করেন। আল্লামা আবদুল হক দেহলভী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি বলতেন, দ্বীনকে বিনোদন বানিও না। স্বেচ্ছাচার ও টাকা রোজগারের হাতিয়ার বানিও না। ওয়াজ, ফতোয়া ও দ্বীনী নেতৃত্বকে তার আহলদের হাতে তুলে দাও। কিন্তু এসব সচেতন আলিমের কথা খুব একটা ফলপ্রসূ হলো না। ফলে মারাঠাদের হাতে উজাড় হলো হাজারো জনপদ, নিঃশেষ হলো শত শত দ্বীনী মারকাজ।
তাহলে প্রচলিত ওয়াজের বিকল্প কী? প্রচলিত ওয়াজের বিকল্প শরিয়া নির্দেশিত ইতিবাচক ওয়াজ। ওয়াজ-নসিহত নবিদের কর্মপদ্ধতি। এমন কোনো নবি নেই, যিনি মানুষকে নসিহত করেননি। হুজুর (সা.)-এর ধ্যান কর্মপদ্ধতি ছিলো নসিহত-ওয়াজ। তাবলিগে রেসালাতের অপরিহার্য হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল ওয়াজ-নসিহত।
সাহাবা-তাবেয়ী যুগে ওয়াজ অব্যাহত থেকেছে দ্বীনের ভাষ্য হিসেবে। বিদগ্ধ বহু সাহাবি, তাবেয়ী ওয়াজ থেকে বিরত থাকতেন। খুব কমসংখ্যক সাহাবি-তাবেয়ী জনসমাগমে ওয়াজ করতেন। তারা ভয় পেতেন, আল্লাহ্‌র কাছে জবাবদিহিতাকে। আপন বক্তব্য ও কর্মে যদি সমন্বয় না থাকে- সে কথা ভাবতেন সর্বদা। নির্দিষ্ট কয়েকজনই মাত্র ওয়াজ করতেন এবং তাদের নসিহত জীবন ও জগতের প্রয়োজন পূরণ করত। খুব দীর্ঘ হতো না সেসব ওয়াজ। আল্লাহ্‌র ভয় ও  আখেরাতের চিন্তা প্রধান্য পেত আলোচনায়। মাসাইল ও আহকামাত বর্ণিত হতো। ভালো কাজের সুফল ও মন্দ কাজের কুফল বর্ণিত হতো তাতে। ছোট ও সীমিত এসব ওয়াজের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ত গোটা মুসলিম জাহানে। আমির-ফকির নির্বিশেষে সবাই এ থেকে দ্বীনী প্রেরণা পেতেন। হতেন ঈমানি বলে বলিয়ান।
সাহাবি, তাবেয়ী এবং তাবে’ তাবেয়ীদের স্বর্ণযুগ অতিবাহিত হওয়ার পর বিভিন্ন কায়দায় ওয়াজে অনুপ্রবেশ করল গোষ্ঠীতন্ত্র। গোষ্ঠীস্বার্থে দ্বীনকে ব্যাখ্যা শুরু হলো। বহু ওয়ায়েজ তাদের ওয়াজে জাল হাদিসের ব্যবহার করতে লাগলেন। ওয়াজের মধ্যে দেখা দিল বিকৃতি ও নৈরাজ্য।
এসব বিকৃতি ও নৈরাজ্য রোধকল্পে যথাযথ কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দিলেন কোন শহরে কারা ওয়াজ করবেন। যদিও সর্ববরেণ্য বুজুর্গদের জন্য সর্বত্র অবারিত ছিল ওয়াজ নসিহত।
এভাবেই চলছিল যুগ যুগ ধরে। এ প্রক্রিয়ার মধ্যেও দেখা গেল বিকৃতি ও বিপর্যয়। শাসকগোষ্ঠী নিজেদের লক্ষ্য বাস্তবায়নে বহু ওয়ায়েজকে ব্যবহার করতে
লাগল। ফলে এ ব্যবস্থাও আস্থা হারাল। ওয়াজ আবারও উন্মুক্ত হলো।
এভাবেই ওয়াজ ব্যবস্থা এগিয়েছে বিবর্তনের মধ্যদিয়ে। যখনই তাতে বিপর্যয় দেখা গেছে, নতুন ব্যবস্থা সামনে এসেছে। তাকে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে আদি ও অকৃত্রিম চরিত্রে।
বর্তমানে ওয়াজব্যবস্থার এক বিরাট অংশ বিকৃতি ও বিপর্যয়ের শীর্ষে অবস্থান করছে। অনেকের কাছে এটা উপাদেয় এক পেশা। বিপুল আয়ের হাতিয়ার। অনেকের কাছে খ্যাতি ও ব্যক্তিত্ব প্রতিষ্ঠার সহজমাধ্যম। অনেকের কাছে ফের্কা ও দলবাজির উপকরণ।
এ সত্বেও অনেক ওয়াজের মধ্যদিয়ে দাওয়াত ও ইরশাদের স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে। যথাযোগ্য উলামাদের একটি অংশ এখনো এ ময়দানে সক্রিয়। ফলত এখনও দ্বীনী প্রয়োজন পূরণে এর আবেদন ও উপযোগ কোন অংশেই কম নয়।
কিন্তু এ সম্ভাবনা মার খাচ্ছে কতিপয় মন্দপ্রবনতা ও অযোগ্যদের দৌরাত্ম্যে। এ প্রবণতা দূর করা গেলে এবং অযোগ্যদের ব্যাপারে উচিত পদক্ষেপ নিলে ওয়াজ আবারো ফিরে পাবে তার প্রাণশক্তি।
এক্ষেত্রে যা করা উচিত, তা হলো-
১. ওয়াজকে ইবাদত হিসেবে গন্য করে তার পবিত্রতা ও স্বচ্ছতায় ফিরিয়ে নেয়া। সুর ও চিৎকারকে মুখ্য হিসেবে গন্য না করা, যদি এগুলো মুখ্য হয়, বুঝতে হবে, এটা বিনোদনের চাহিদা। ইবাদতের চাহিদা নয়। তবে বক্তব্য কে জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য ও তাদেরকে আগ্রহী করার জন্য প্রয়োজনে শোভনীয় সুর এবং তাল লয় ঠিক রেখে আওয়াজ উঁচু নিচু করায় বাধা নেই।
২. ওয়াজ করতে নির্ধারিত হারে টাকা দাবি করা শারিয়া সম্মততো নয়ই; রুচিহীনতাও বটে। ওয়াজকে যারা ব্যবসা হিসেবে নিয়েছেন তাদেরকে পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। তবে ওয়ায়েজদেরকে যাতায়াত খরচ এবং যুক্তিসংগত হাদিয়া দেয়া যেতে পারে।
৩. ওয়াজ মাহফিলগুলো সাধারণত মানুষের অনুদানে পরিচালিত হয়। দ্বীনি কাজে ব্যবহারের নিয়তে তারা অনুদান দিয়ে থাকেন। অতএব তা ব্যবহারে সাবধানতা অবলম্বন খুবই জরুরি। অপচয় কোনভাবেই কাম্য নয়। অতএব বাহুল্য, বাহারি সজ্জা ও জাকজমক পরিহার করে ব্যয়কে সর্বনিম্নে নামিয়ে আনা উচিত।
৪. যেসব এলাকায় মাদরাসা রয়েছে, সেখানে মাদরাসার মাহফিলই মূল মাহফিল হয়ে থাকে। মাদরাসাগুলো ওয়াজের মাধ্যমে জনসাধারণের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে থাকে। এ মাহফিলের মাধ্যমেই মাদ্রাসাগুলোর সারা বছরের খরচের একটি বড় অংশ আহরিত হয়। যা দ্বীনী শিক্ষায় গতি যোগায়। অতএব সম্ভব হলে স্থানীয় সংস্থার ওয়াজকে মাদরাসার ওয়াজের সাথে যুক্ত করে নেয়া যেতে পারে।
৫. আওয়াজকে শ্রোতামণ্ডলী পর্যন্ত সীমিত করে রাখাটাই বাঞ্ছনীয়। বিশেষত রাতের বেলায়। অন্যের ঘুম, ইবাদাত বন্দেগি এবং অন্যান্য কার্যক্রম যেন ওয়াজ মাহফিলের কারণে ব্যাহত না হয় সে দিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া আবশ্যক। মনে রাখতে হবে দাওয়াতী কার্যক্রম যেন অন্যের বিরক্তির কারণ না হয়ে যায়।
৬.অতিথি নির্বাচনে সেসব আমলদার ও বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামকে প্রাধান্য দিন, যাদের ওয়াজ জীবনঘনিষ্ঠ ও  ইতিবাচক। ক্বুরআন, সহিহ হাদিস, প্রামাণ্য ও বস্তুনিষ্ঠ ঘটনাবলী দ্বারা যাদের বক্তব্য সজ্জিত । অনির্ভরযোগ্য ও মিথ্যা কাহিনীমুক্ত নিত্যকার প্রয়োজনীয় আমল আখলাকের কথা যাদের বক্তব্যে রয়েছে।
৭. অপরাধপ্রবনতা দূরীকরণে ইতিবাচক ওয়াজ করুন। দলিল ও যুক্তি দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করুন। হৃদয়ের ভাষায়, দরদ দিয়ে কথা বলুন। অনর্থক ও অযৌক্তিক চেঁচামেচি ও চিৎকার পরিহার করুন।
৮. কোন পক্ষকে আঘাত করা থেকে বিরত থাকুন। মনোপলি মনোভাব পরিহার করুন। প্রকৃত মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে মাদ্রাসা শিক্ষার ভূমিকা নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য। তাই বলে একমাত্র মাদরাসা শিক্ষাই প্রকৃত মানষ তৈরি করে- এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে জাগতিক শিক্ষার গুরুত্বকে অস্বীকার করবেন না। মনুষ্যত্ব কোনো বিশেষ প্রতিষ্ঠানের স্বত্ব নয়। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের আঘাত করবেন না। দ্বীন দুনিয়ার সমন্বয়ের পয়গাম শ্রোতাদের মাঝে তুলে ধরুন।
৯. নিজের নামের সাথে বাহুল্য পদবী ও উপাধি ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। মুফাচ্ছিরে ক্বুরআন, মুহাদ্দিস এগুলো তাফসির ও হাদিস শাস্ত্রের নিজস্ব পরিভাষা। মুফাসসির ও মুহাদ্দিস এর গুণাবলী ও শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও এসব পরিভাষার ব্যবহার মিথ্যাচারের শামিল। আল্লামা অর্থ মহাজ্ঞানী। এই শব্দের ব্যবহার জেনে বুঝে করছেন তো। মনে রাখবেন, আপনি দায়ী ইলাল্লাহ; বিজ্ঞাপন নির্মাতা কিংবা তথাকথিত মার্কেটিং অফিসার নন যে, যা ইচ্ছা তা লিখে দিবেন বা বলে ফেলবেন।
১০. চরমপন্থা পরিহার করে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করুন। মানুষকে সুসংবাদ দিন; যত্রতত্র দুঃসংবাদ দেয়া থেকে বিরত থাকুন। মানুষকে নিরাশ করবেন না। দয়া করে যাকে তাকে কাফের বানাবেন না। ওয়াজ তো কাফেরকে মুসলমান বানানোর জন্য, মুসলমানকে কাফির বানানোর জন্য নয়।
আপনার ফের্কাগত প্রতিপক্ষ মানেই জাহান্নামি নয়। তাদের বিরোধিতার ক্ষেত্রে শার’ঈ মাত্রা অবলম্বন করুন। আপনার ওয়াজ থেকে অন্য ঘরানার মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা নিয়ে লোকেরা যেন বাড়ি না ফেরে। ওয়াজ শুনে অন্য মুসলিমের প্রতি দরদ ও কল্যাণকামিতার পরিবর্তে বিদ্বেষ ও হিংসা যদি হয় লোকদের অর্জন, তাহলে এ ওয়াজ আত্মধ্বংসী । সেখানে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ফখরুদ্দীন ইরাকী রহ.।
ওয়াজ যদি আদাবে দাওয়াত ও তাকাযায়ে হিকমাহর ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে তা অবশ্যই দ্বীনের কল্যাণ নিশ্চিত করবে। তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এতে অংশ গ্রহণ করছে। অপসংস্কৃতির প্রতি যারা ধাবমান হতে পারত, তাদের একটি অংশ উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে ওয়াজের আয়োজন ও সংগঠনে জড়িত। সত্যিকার দায়ী ইলাল্লাহ ও আহলুল্লাহ আলেমদের তত্ত্বাবধান ও নির্দেশনায় তা মন্দপ্রবনতা থেকে মুক্ত হোক ।
বিনোদনের উদ্দীপনা ইখলাসের দাবির কাছে পরাজিত হোক। জাতীয় কল্যাণ ও শুভবোধ নিশ্চিত করণে ওয়াজ হয়ে উঠুক শুদ্ধির সরোবর। যেখানে হৃদয় ও জীবনের কালো দাগগুলো ধুয়ে মানবতা ফিরে পাবে চিরন্তন পবিত্রতা। লেখক: ইসলামী অর্থনীতিবিদ ও গ্রন্থকার।

News Page Below Ad