সন্তানের জন্য দুধ চুরি করেছে… এই কথাটি আমি বিশ্বাস করি। আপনারা যারা বিশ্বাস করেন না, তারা সোনার চামচ মুখে দিয়ে বেঁচে আছেন, আপনাদেরে অনেক অভিবাদন। কিন্তু আমি এসব মানুষকে এই ঢাকা শহরে দেখেছি অসংখ্যবার। বেসরকারি চাকরিজীবী মধ্যবিত্তের মতো অসহায়, ভালনারেবল প্রাণী আর দ্বিতীয়টি নেই। এই শহরে সবাই তাকে ছিঁড়ে খুবলে খেতে দাঁত-নখ বের করে বসে আছে। আমার মনে আছে, ভোরের কাগজে যখন মাসের পর মাস বেতন বকেয়া পড়ে গেলো, তখন আমাদের কলিগদের সেই মানবেতর অবস্থা। আমরা বয়সে তরুণ ছিলাম, বাসায় থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা ছিলো তাই সমস্যায় পড়তে হয়নি। কিন্তু আমাদের সিনিয়ররা যারা ছিলেন, তারা বড্ড অসহায় অবস্থায় ছিলেন। মধ্যবিত্ত সহজে ধার চাইতে পারে না, আর চাইলেও চাইতে হয় তার মতোই আরেকজনের কাছে যার নিজেরই নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। বাড়িভাড়া বকেয়া পড়লে বাড়িওয়ালাদের বাক্যবান তাকে হজম করতে হয়, স্কুলের বেতন একমাস বাকি পড়লে বাচ্চাকে পর্যন্ত হেনস্তার শিকার হতে হয়।
কিন্তু এই শহরে এসব অহরহই ঘটে চলছে। মিড লেভেলের লোকজনের বেতন বেশি নয়। হুট করেই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায় অথবা মালিক আগ্রহ হারিয়ে ফেলে… তখন তারা চাকরিচ্যুত হন। আমাদের মতো মানুষের দক্ষতাও খুব বেশি থাকে না যে একটা বয়সের পর নতুন করে চাকরি পাবেন কোথাও। চাকরিকালীন বেতনও এমনভাবে থাকে যে ওই টাকা দিয়ে কোনো রকমে শুধু বেঁচে থাকা যায়, দুটো টাকা সঞ্চয় করা যায় না। সরকারি-বেসরকারি সবাই আছে কীভাবে সেই টাকাগুলো হাতিয়ে নিতে পারে, সেই চেষ্টায়। তাই সঞ্চয়ের চেষ্টা বৃথা। আর যদিও দু’ টাকা সঞ্চয় হয় কারো, শেয়ার বাজারিরা হাতিয়ে নেয় সেগুলো, নয় তো এ রকম আরো কোনো চেষ্টায় নষ্ট হয় টাকা। জমি বুকিং দিলে পুরো কোম্পানিই হাওয়া হয়ে যায়, জীবন বীমা করলে তারপর হুট করে বিপদে ভাঙাতে গেলে জমা দেয়া আসল টাকা থেকেই বরং কেটে রাখে টাকা, কাউকে ধার দিলে সেই টাকাও যায়, সম্পর্কও যায়। এ এক বড্ড অদ্ভুত চক্র।

এই নগরে বেসরকারি চাকরিজীবীদের চাকরি আর দিনমজুরের ভাগ্য একই সুতোয় বাঁধা। আজ কাজ আছে তো কাল নেই। সঞ্চয়হীন, বিকল্প আয়হীন, আহামরি যোগ্যতাহীন এই মানুষগুলোই এই নগরে অনেক। তাদের নিয়ে উপহাস না করি আমরা। হয়তো এই ঘটনাটা নিছক গল্পই। কিন্তু বাসের ভিড়ের নারী, ফুটপাথে গা ধাক্কা লাগা লোকটা আসলে এই গল্প থেকে খুব দূরে নয় এই নগরে। আপনাকে-আমাকে যদি সেই কষ্টের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে সৃষ্টিকর্তার কাছে শোকর-গোজার করতে পারেন, কিন্তু দয়া করে অন্যকে উপহাস করবেন না। ফেসবুক থেকে
সূত্র:আমাদেরসময়