কেউ ’চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা’ নিয়ে কথা বলেন না, সবাই কথা বলেন ডাক্তারদের হাসপাতালে না থাকা নিয়ে। তাদেরকে ’ফ্যাজলামি করেন’ বলা সহজ। কারণ ডাক্তারদের দিক থেকে কোনো প্রতিবাদের সম্ভাবনা নেই। এমন কী ডাক্তারদের বাস্তবতা তুলে ধরারও সম্ভাবনা নেই। ডাক্তারদের প্রতিষ্ঠান বা ডাক্তার নেতা,আর রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক নেতার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ’ফ্যাজলামি করেন’ বলাওয়ালা যে প্রক্রিয়ায় ’ওই’ জায়গায় পৌঁছেছেন, ডাক্তার নেতারাও সেই প্রক্রিয়ায় ’ওই’ জায়গায় পৌঁছতে চান। যদি ’ওই’ জায়গায় পৌঁছানোর নৈতিকতা নিয়ে ডাক্তাররা প্রশ্ন তুলতে পারতেন,তাহলে হয়ত চিত্রটা ভিন্ন হতে পারত।পারস্পরিক জবাবদিহিতার সম্ভাবনা দেখা দিত।
চিকিৎসকদের হাসপাতালে না থাকার পেছনে যুক্তি দেওয়ার কিছু নেই,কিন্তু সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয় আছে। সেকারণেই বারবার বলি ’চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা’র কথা।,ডাক্তার নেতারাও যা বলেন না।’ চিকিৎসা ব্যাবস্থাপনা’ ঠিক হলে,হাসপাতালে ডাক্তারদের থাকা থেকে শুরু করে অনেক সমস্যার সমাধান পাওয়া যেত।
’চিকিৎসা ব্যাপস্থাপনা’ ঠিক করার দায়িত্ব ’ফ্যাজলামি করেন’ বলাওয়ালাদের, ডাক্তারদের নয়। দলীয় রাজনীতির কাছে বিবেক জমা রাখায়,ডাক্তার নেতারা যা বলতে পারেন না।
ডাক্তার হাসপাতালে থাকুক তা সব মানুষের চাওয়া। তারপরও ’ফ্যাজলামি করেন’ শুনে মানুষ হাসছে বা তিরস্কার করছে কেন?কারণ নিজে অনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশীজন হয়ে,নীতি বা নৈতিকতার কথা বললে,হাসা ছাড়া মানুষের কিছু করার থাকে না।
দৃশ্যপট ১
’সরকার যদি এত ভালো,তবে আমাদের এত কষ্ট কেন’-প্রখ্যাত লেখক মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাসের একটি উক্তি। লাইনটি হুবহু এমন ছিল-
’তুই যদি ভালো গোরমেন, তবে আমাদের এত কষ্ট কেন?’
এই সূত্র ধরে চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি ঘটনা বলি।যদিও ঘটনাটি আগে বেশ কয়েকবার বলেছি:
১৯৮৯ সালের কথা। মালয়েশিয়ার অবস্থা মোটেই উন্নত নয়। সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-চিকিৎসা কোনো ব্যবস্থাই সমৃদ্ধ বা উন্নত নয়। রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছেন মাহাথীর মোহাম্মদ। পেশায় চিকিৎসক মাহাথীর বুকে ব্যথা অনুভব করলেন। তার স্ত্রীও একজন ডাক্তার। ধরা পড়ল মাহাথীরের হৃদযন্ত্রের সমস্যা। ব্লক আছে। বাইপাস সার্জারি করতে হবে। সেই সময় মালয়েশিয়ার রাজনীতিবিদ-আমলা-ব্যবসায়ীরা চিকিৎসার জন্যে আমেরিকা বা লন্ডনে যেতেন। কেউ কেউ সিঙ্গাপুরেও যেতেন। মাহাথীরের চিকিৎসার উদ্যোগ চলতে থাকল। তাকে নিয়ে যাওয়া হবে লন্ডনে। প্রশ্ন করলেন, কেন লন্ডন? কেন মালয়েশিয়া নয়?
বলা হলো, মালয়েশিয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থা যেহেতু অতটা উন্নত বা পরীক্ষিত নয়, সুতরাং এ ধরনের অপারেশনের জন্যে ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না। পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থায় অপারেশন করতে হবে, তাতে ঝুঁকি কম থাকবে।
মাহাথীর যুক্তি দিলেন, আমার অপারেশন তো মালয়েশিয়ান ডাক্তাররাই সবচেয়ে গুরুত্ব এবং যত্ন নিয়ে করবেন। তাছাড়া আমাদের ঐতিহ্যও তৈরি করা দরকার। আমরা বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করলে সাধারণ মালয়েশিয়ানরা তো বিদেশেই যাবে, দেশে ভরসা করবেন না। সুতরাং আমার অপারেশন মালয়েশিয়াতেই হবে।
পুরো প্রশাসন রাজি নন। মাহাথীর অনড়। অবশেষে সবাই রাজি হলেন। অপারেশন মালয়েশিয়াতেই হবে। তারপরও সিঙ্গাপুর থেকে যোগাযোগ করলেন লি কুয়ান ইউ। লন্ডনের পরিবর্তে সিঙ্গাপুরে অভিজ্ঞ সার্জনের অধীনে অপারেশন করানোর প্রস্তাব দিলেন। তাতেও রাজি হলেন না মাহাথীর। মাহাথীরের অপারেশন মালয়েশিয়াতেই হলো, সফলভাবে হলো।
ইউরোপভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা অনুযায়ী মালয়েশিয়া এখন চিকিৎসা সেবায় পৃথিবীতে প্রথম। বাংলাদেশ থেকে তো বটেই, উন্নত সেবা খরচ কম বিবেচনায় ইউরোপ এমন কী অস্ট্রেলিয়া থেকেও মানুষ চিকিৎসার জন্যে মালয়েশিয়াতে আসেন।
মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাসের উক্তি এখনকার প্রেক্ষিতে হতে পারত এমন:
’দেশের এবং চিকিৎসার যদি এত উন্নতি,তবে কেন বিদেশ…?’
দৃশ্যপট ২
আগারগাঁওয়ের ’ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতাল’-একটি অসাধারণ সরকারি হাসপাতাল।গুরুতর অসুস্থ হয়ে এক আত্মীয়র ভর্তি,১০ দিন অবস্থান ও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।
৩০০ শয্যার এই সরকারি হাসপাতালটির ডাক্তার-নার্সসহ সকল কর্মীরা নিরলসভাবে গুরুতর অসুস্থ মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।ডিউটি ডাক্তার,বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ,নার্স…কাউকে খোঁজ করে ডেকে আনতে হয় না।নিয়ম করে তারা নিয়মিত আসেন।হাসপাতাল থেকে ওষুধ সরবারাহের চিত্রও সন্তোষজনক। হাসপাতাল থেকে সরবারাহ করা খাবারের মান ভালো।ক্যান্টিন-বাথরুম-পুরো হাসপাতাল পরিস্কার-পরিছ্ন্ন।
শয্যা সংখ্যার চেয়ে প্রতিদিন দ্বিগুণ-তিনগুণ রোগী আসেন।আসন সংখ্যার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি করা হয় না। ভর্তি হতে না পেরে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয় অনেক রোগীকে।বর্তমান ব্যবস্থাপনায় আরও বড় পরিসরে হাসপাতালটি পরিচালনা করা গেলে অধিক সংখ্যক গরীব -মধ্যবিত্ত বিশ্বমানের সেবা পেতে পারতেন।অন্যান্য সরকারি হাসপাতাল গুলোর ব্যবস্থাপনাটা ঠিক করলে,দেশেই ভারত-থাইল্যান্ড-সিঙ্গাপুর মানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যেত।
কয়েকদিন পরপর একেক জনকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ডেকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে সিঙ্গাপুর পাঠাতে হতো না।একজনকে সিঙ্গাপুর পাঠাতে,চিকিৎসা করিয়ে আনতে যত কোটি টাকা খরচ হয়,তা দিয়ে হয়ত এসব হাসপাতাল কয়েক হাজার মানুষের কয়েক মাস সেবা দিতে পারে।
তা হয়ত হওয়ার নয়, কারণ দেশে চিকিৎসা নেওয়ার কথা বলা,আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছে কথার কথা’র চেয়ে বেশি কিছু নয়।
সংযুক্তি: হৃদরোগ ইনন্সিটিউট,বঙ্গবন্ধু মেডিকেল, ঢাকা মেডিকেল…সহ সরকারি হাসপাতালগুলো যে কোনো বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে ভালো সেবা দেয়। সামর্থ্যের চেয়ে পাঁচ সাতগুণ বেশি রোগীর সেবা দিতে হয় বলে তা দৃশ্যমান হয় না। ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে মেশিন নষ্ট থাকে,কিছু ডাক্তার ফাঁকি দেন। অধিকাংশ ডাক্তার অধিক পরিশ্রম করেন। অনেকেই দ্বিমত করতে পারেন। কারণ ব্যবস্থাপনার দিকটা আমরা বিবেচনায় নেই না এবং ডাক্তারদের গালাগালি করতে পছন্দ করি।
লেখক:সিনিয়র সাংবাদিক।