নাম কি? নাম- মানুষ।
ধাম? ধাম- পৃথিবী।
ঠিকানা?
এ প্রশ্নের জবাব এক কথায় দেয়া যাবে না। এ প্রশ্নের জবাব দেবার জন্যেই এই বই।’
বইটির নাম ‘মানুষের ঠিকানা’।
লেখক অমল দাশগুপ্ত।
অনেক বছর আগে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্রে পড়েছিলাম। মানুষ ও পৃথিবী সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য যুক্তি দিয়ে আলোচনা করেছেন লেখক। না, এই বই নিয়ে লিখছি না।
আজ আমরা যা কিছু দেখি তার কোনও কিছুই হঠাৎ করে হয়নি। লাখ-কোটি বছরের ইতিহাস আছে তার পেছনে। মানুষের এই পৃথিবীতে ‘মানুষ’শব্দটি বারবার আলোচনায় আসে। সম্প্রতি আলোচনায় আনলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আমরা প্রায়ই বলি বা শুনি ‘মানুষ আর মানুষ নেই। অমানুষ হয়ে গেছে, যন্ত্র হয়ে গেছে, পশুর পর্যায়ে চলে গেছে।’
মানুষ কোথায় চলে গেছে বা যাচ্ছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে, সেই আলোচনায় আসার আগে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যটি স্মরণ করি। তিনি বলেছেন, ‘এটাকে (গ্রামীণ ব্যাংক) এখন মানুষ করা দরকার।’
একটি প্রতিষ্ঠানকে তো আর মানুষ বানানো যায় না, অর্থমন্ত্রী তা বোঝাতেও চাননি। যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো, সঠিক পথে নেই, এটাকে (গ্রামীণ ব্যাংক) সঠিক পথে আনতে হবে। খারাপকে ভালো করতে হবে, ভুল পথ থেকে সঠিক পথে আনতে হবে, অমানুষকে মানুষ বানাতে হবে, এসব তো অত্যন্ত প্রশংসনীয় বক্তব্য। এই বক্তব্যকে অনুধাবন করে উদ্যোগ নিলে তা হবে সর্বজন প্রশংসিত। মুখের বক্তব্য, বাস্তবের উদ্যোগ বা কর্মের মিল বা অমিল কতটা? অমানুষকে মানুষ না মানুষকে অমানুষ বানাতে চাইছি? প্রশ্নগুলো সামনে এসে যাচ্ছে। ‘দেশ এগিয়ে যাচ্ছে’ খুব পরিচিত রাজনৈতিক বক্তব্য। এগিয়ে কোন দিকে যাচ্ছে?
১. প্রথমে আসি গ্রামীণ ব্যাংককে মানুষ করা প্রসঙ্গে। ইতিহাস বলব না। নোবেলজয়ী এই প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস সম্পর্কে কম-বেশি সবাই জানি। সংকট শুরু হওয়ার আগে-পরে, গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে গুরুতর কিছু অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে।
ক. গ্রামীণ ব্যাংক গরিব মানুষদের শোষণ করে।
খ. ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে গ্রামের মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন।
গ. জুলুম-নির্যাতন করে ঋণ আদায় করা হয়। ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে মানুষ আত্মহত্যা করেন।
ঘ. ঋণের সুদের হার অনেক বেশি।
ঙ. গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
চ. ড. ইউনূস ‘সুদখোর’।
২. গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য সংখ্যা ৮৪ লাখ। আজ পর্যন্ত পাঁচ সাত জনের প্রসঙ্গ সুনির্দিষ্ট করে আলোচনায় এসেছে। তারা ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বলা হয় তারা সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। ধরে নিলাম ‘সর্বস্বান্ত’ হয়েছেন, ক্ষতির সর্বোচ্চটাই তাদের হয়েছে।
৮৪ লাখের মধ্যে পাঁচ-সাত জন! এটা কি ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে?
গ্রামীণ ব্যাংক সংকটের এই গত কয়েক বছরে ৮৪ লাখ সদস্যের একজনকেও পাওয়া যায়নি, যিনি বা যারা বলেছেন যে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত বা সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। তাদের কাছে এখনও ড. ইউনূস সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার মানুষ। যদি সর্বস্বান্তই হবেন, তাদের কাছে এখনও কেন গ্রামীণ ব্যাংক বা ড. ইউনূস শ্রদ্ধার আসনে থাকবেন? সরকারের নানা সংস্থা, এজেন্সি ভয়ভীতি দেখিয়ে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে কথা বলানোর কম চেষ্টা তো করেনি।
ঋণ আদায়ে জুলুম-নির্যাতন গল্পে যতটা, বাস্তবে ততটা নয়। গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ আদায়ে এক ধরনের কঠোর মনিটরিং আছে। প্রচলিত ব্যাংকিং ধারায়ও তা থাকে। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যেহেতু অসততা ও রাজনৈতিক চাপ থাকে, ফলে ঋণ আদায় হয় না। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষেত্রে অসততা ও রাজনৈতিক চাপ না থাকায়, ৯৮% এরও বেশি ঋণ আদায় হয়।
কৃষি, সোনালী বা সরকারের অন্যান্য ব্যাংকের যে ঘুষ-দুর্নীতি, তার বিপরীতে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণের সুদের হার মোটেই বেশি নয়। যেকোনও নির্মোহ বিশ্লেষণে সেই সত্যতার প্রমাণ মিলবে।
৩. গ্রামীণব্যাংক ও ড. ইউনূসের অনিয়ম-দুর্নীতি খুঁজে বের করার জন্য তদন্ত কমিটি করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে, কয়েক বছর তদন্ত করে, এক টাকার অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণও তারা পায়নি। সুতরাং দুর্নীতির অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
ব্যক্তি থেকে আপনি যদি ১০০ টাকা ঋণ নেন এই শর্তে যে, মাস শেষে ১২০ টাকা ফেরত দেবেন। এক্ষেত্রে ব্যক্তির লাভ ২০ টাকা। বলা যাবে তিনি ২০ টাকা সুদ নিয়েছেন। এও বলতে পারেন তিনি ‘সুদ’ খান। আরও কঠোর ভাষায় বলতে পারেন ‘সুদখোর’।
প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে হিসাবটা কেমন?
ধরুন, আপনি সোনালী ব্যাংক থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। সুদের হার হয়ত ১২%। ১২% সুদসহ টাকা পরিশোধ করছেন। এই সুদের অর্থ পাচ্ছে সোনালী ব্যাংক। সোনালী ব্যাংক কোনও এমডি বা কোনও ব্যক্তির নয়। সোনালী ব্যাংক সরকারের মানে দেশের সব মানুষের। সুদ থেকে লাভবান হচ্ছে সরকার বা দেশের সব মানুষ। এক্ষেত্রে আপনি কঠোর শব্দে সরকার বা দেশের সব মানুষকে ‘সুদখোর’ বলতে পারেন, ব্যাংকের এমডি বা কোনও ব্যক্তিকে নয়। কারণ একক ব্যক্তি ব্যাংকের মালিক নয়।
গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক কে?
৮৪ লাখ সদস্য এবং ২৫% সরকার (আগে আরও কম ছিল)। ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এবং বেতনভুক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। গ্রামীণ ব্যাংকে তার কোনও মালিকানা ছিল না, নেই। সুদের বা গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবসার লাভ থেকে একটি টাকাও তিনি নেননি, নিতে পারেননি। যেভাবে নিতে পারেন না সোনালী ব্যাংক বা জনতা ব্যাংকের এমডি।
যারা ড. ইউনূসকে ‘সুদখোর’ বলেন, তারা জেনে বলেন? নাকি না জেনে বলেন? এটা কি ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা? নাকি জেনে-বুঝে ঈর্ষা থেকে বলেন?
‘সুদখোর’ বিষয়ে আরও পরিষ্কার করে বলি। আপনি ব্যাংকে টাকা রেখে সুদ পাচ্ছেন। তার মানে আপনি ‘সুদখোর’! বাংলাদেশের কতজন মানুষ তাহলে ‘সুদখোর’ নয়! ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ‘সুদ’ দিচ্ছেন। সাধারণ কৃষক থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে কতজন ‘সুদ দেওয়া-নেওয়া’-প্রক্রিয়ার বাইরে আছেন? সারা পৃথিবীর অর্থনীতি চলছে ‘সুদ’-এর ওপর। বিদেশ থেকে বাংলাদেশ সরকার ঋণ আনছে, তার মানে দেশের প্রতিটি নাগরিক সুদের বিনিময়ে ঋণ আনছেন। সুদসহ পরিশোধ করছেন।
সুতরাং যারা ড. ইউনূসকে ‘সুদখোর’ বলেন, তাদের প্রতি করুণা ছাড়া আর কিছু বলার নেই।
৪. যে প্রতিষ্ঠানটি ড. ইউনূস গড়ে তুলেছেন, শতভাগ সঠিক পথে পরিচালনা করেছেন। নিজে ও প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত নোবেল পুরস্কারের সম্মান অর্জন করেছেন। অন্যায়-অনিয়ম-দুর্নীতি আগেও ছিল না, এখনও নেই। ড. ইউনূসের দেখানো পথে এখনও গতিশীলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সেই প্রতিষ্ঠানকে ‘মানুষ’ করার প্রয়োজন পড়ছে কেন?
অর্থমন্ত্রীর সরাসরি আওতায় বেশ কিছু ব্যাংক আছে। সোনালী, কৃষি, জনতা, বেসিক প্রভৃতি। ‘মানুষ’ করা মডেল হিসেবে কি আমরা এই ব্যাংকগুলোকে বুঝব? নাকি বাংলাদেশ ব্যাংককে বুঝব?
অর্থমন্ত্রীর আওতার এই ব্যাংকগুলো লোপাট হয়ে গেল, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরি হয়ে গেল। ব্যবস্থা নেওয়া হলো না, তদন্ত রিপোর্ট আটকে রাখা হলো। এগুলো কি ‘মানুষ’ করার মডেল? গ্রামীণ ব্যাংককে কি এমন মডেলে রূপান্তর করতে চাইছেন অর্থমন্ত্রী?
‘এগিয়ে যাওয়া বা মানুষ করা’ বলতে আমরা কি পেছনে ধাবিত হওয়া বুঝি? না সেই তেল মাখানো বাঁশ বেয়ে বানরের ওঠা-নামা বুঝি?
অর্থমন্ত্রীর কাছে তো খারাপকে ভালো করার কোনও দৃষ্টান্ত দেখছি না। ভালো, লাভজনক বেসিক ব্যাংককে খারাপ বা লোকসানি বা প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত দেখছি।
৫. প্রতিষ্ঠানকে ‘মানুষ’ করা তো দূরের কথা, মানুষকে ‘মানুষ’ করার চিন্তাতেই আমরা নেই। প্রতিষ্ঠানকে ‘মানুষ’ করার জন্যে ‘মানুষ’ গড়ে তোলা দরকার, মানুষের ‘উন্নয়ন’ দরকার। উন্নয়ন বলতে আমরা এখন মানবসম্পদ উন্নয়ন বুঝি না। আমাদের কাছে ‘উন্নয়ন’ মানে ব্রিজ বা ফ্লাইওভার। ব্রিজ বা ফ্লাইওভার নির্মাণ পরিকল্পনা যারা করবেন তাদের উন্নয়ন না হলে, যা হওয়ার তাই হচ্ছে। ৩০০ কোটি টাকার কাজ ১৫০০ কোটি টাকায়ও হচ্ছে না। এই ফর্মুলায় গ্রামীণ ব্যাংককে আপনি বেসিক ব্যাংকে পরিণত করতেই পারেন। সেই ক্ষমতা আপনার বা আপনাদের আছে!
শিক্ষার মান নিয়ে সমালোচনা আপনাদের পছন্দ না। প্রশ্ন ফাঁস হবে, ব্যবস্থা নেবেন না। কথা বললে গোস্বা করবেন, হুমকি দেবেন। পাঠ্য বইয়ে ছাগলকে গাছে উঠিয়ে আম খাওয়াচ্ছেন। কুসুম কুমারী দাশের বিখ্যাত কবিতা ‘শুদ্ধ’ করে লিখছেন। Hurt কে Heart শেখাচ্ছেন। এসব যারা করছেন, তারা কারা? কাদের দিয়ে কী করাচ্ছেন? কে কাকে মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছে? শিশু-কিশোরদের মানুষ করার দায়িত্ব কাদের হাতে দিয়েছেন?
প্রশ্নগুলোর উত্তর কি দিতে হবে না কোনও দিন!
সংবিধান রক্ষা নিয়ে আপনাদের সে কী দুঃশ্চিন্তা! আর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে লিখছেন ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’। পাঠ্যসূচি, বই বা সরকারি কার্যক্রম আর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম তো এক নয়। ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক স্লোগান। অবশ্যই আওয়ামী লীগ এই স্লোগান দিতে পারে, দেবে। কিন্তু সরকার তো চলে সংবিধান অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নয়। সংবিধানের কোথাও লেখা নেই ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’। অথচ ন্যাশনাল কারিকুলাম ও টেক্সটবুক বোর্ড তা লিখছে।
শিশু-কিশোরদের কাছে বই পৌঁছানোয় অতীতের কোনও সরকার এই সাফল্য দেখাতে পারেনি, আপনারা পেরেছেন। বড় ধন্যবাদ অবশ্যই প্রাপ্য। বিশাল এই সাফল্যের জন্য অবশ্যই অভিনন্দন। কিন্তু মান নিয়েও তো একটু ভাবতে হবে। হুকুম দিয়ে পাস করাবেন, গাঁজার নৌকার আকাশ দিয়ে যাত্রার মতো, ছাগলকে গাছে উঠিয়ে দেবেন! এই বই পড়ে শিশু-কিশোরদের মানুষ করবেন? কেমন মানুষ হবে তারা? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি একবার করে দেখবেন? অন্তত গ্রামীণ ব্যাংককে ‘মানুষ’ করার উদ্যোগ নেওয়ার আগে প্রশ্নটি একবার করুন।
লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক
.banglatribune

News Page Below Ad