করোনা ভাইরাস চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে শুরু হয় একে একে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে । চীন থেকে ইতালিতে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে হটস্পট বানিয়ে বেশ ভালোভাবেই জাঁকিয়ে বসেছে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটি । ক্ষুদ্র আনুবীক্ষনিক এক দানবের দাপটে লকডাউন হয়ে গোটা মানব সম্প্রদায় যেন লুকিয়ে পড়েছে অজানা আশংকায়।
তবে দীর্ঘদিন ধরে ভালো অবস্থানে থাকা রাশিয়া জাপান কিংবা সিঙ্গাপুরেও ধীরে ধীরে বাড়ছে করনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব । তাই কে হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের পরে করোনা ভাইরাসের নতুন হটস্পট এ তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সকলের মধ্যে ।

রাশিয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ৪ হাজার ৭৮৫ জনসহ আক্রান্তের সংখ্যা ৩৭ হাজার ছুঁইছুঁই।

জাপানেও পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। দেশটিতে শনাক্ত রোগী ১০ হাজারের বেশি। সিঙ্গাপুরে আক্রান্তের হার বাড়লেও এদের বেশিরভাই অভিবাসী বলে দাবি করছে দেশটির সরকার। সংক্রমণ বেড়েছে ব্রাজিল ও ভারতেও। এরপরও অর্থনীতি বাঁচাতে সীমান্ত খুলে দিতে চান ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো। ভারতে নৌবাহিনীর ২১ সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন।

এদিকে বিশ্বে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যায় শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ঝড় চলেই। ইতোমধ্যে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৭ লাখ ছাড়িয়েছে। এমন দুর্যোগে দরিদ্র কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কৃষকদের জন্য ১৯ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। খবর বিবিসি, রয়টার্স ও এএফপিসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের।

বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ওয়ার্ল্ডওমিটারসের তথ্য অনুযায়ী- বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২২ লাখ ৭৭ হাজার ৮৫২ জন। মারা গেছেন ১ লাখ ৫৬ হাজার ১৯৯ জন। অবস্থা আশঙ্কাজনক ৫৬ হাজার ৯৬৩ জনের। সুস্থ হয়েছেন ৫ লাখ ৮২ হাজার ৭৫৮ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৬ হাজার ৪৯৭ জন। মারা গেছেন ৮ হাজার ৬৭২ জন।

যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা ৭ লাখ ১১ হাজার ৫৫৮ জন। মারা গেছেন ৩৭ হাজার ২৩৩ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে ২৫৩৫ জনের। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৩২ হাজারের বেশি। দেশটিতে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ৬০ হাজার ৫১০ জন। করোনায় যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বিপর্যস্ত নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য। সেখানে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৫১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ১৭ হাজার ১৩১ জন। অর্থাৎ দেশটিতে মোট আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশ এবং মৃতের প্রায় অর্ধেকই নিউইয়র্কে।

করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে অন্যান্য দেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ অবস্থায় দেশের দরিদ্র কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও দরিদ্রদের খাদ্য সহায়তার জন্য ১৯ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন তিনি। শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বললেন, বৈশ্বিক মহামারীর মধ্যে টিকে থাকতে আমাদের কৃষক ও খামারিদের জন্য ১৯ বিলিয়ন ডলারের ত্রাণ কার্যক্রম চালু করতে যাচ্ছে সরকার। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কৃষক, খামারের মালিক ও উৎপাদনকারীদের সরাসরি অর্থ সহায়তা দেয়া হবে।

কৃষি সচিব সনি পারডিউ বলেন, স্কুল ও রেস্তোরাঁ এখন বন্ধ এবং আমেরিকানরা ঘরেই খাবার খাচ্ছে বলে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা নেই। ভেঙে পড়েছে খাদ্য সরবরাহের ?শৃঙ্খল, ক্রেতা না থাকায় উৎপাদিত পণ্য নষ্ট হচ্ছে কিংবা দাম পড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, প্রণোদনার ৩ বিলিয়ন ডলার দিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে কৃষিজ পণ্য ও দুধ কেনা হবে, সেগুলো রাজ্যের বিভিন্ন খাদ্য ব্যাংকে সরবরাহ করা হবে।

রাশিয়ার আক্রান্ত ৩৭ হাজার ছুঁইছুঁই : শুরু থেকে বেশ শক্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থার মধ্যে থেকেও করোনাকে আটকাতে পারেনি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ রাশিয়া। দেশটিতে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৯৩ জন। মৃত্যু হয়েছে ৩১৩ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ৪১ জন, এ সময়েং নতুন করে সংক্রমিত হয়েছেন ৪ হাজার ৭৮৫ জন। দেশটিতে এখন পর্যন্ত এটাই একদিনে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের ঘটনা। এপ্রিলের শুরুর দিকে রাশিয়ায় করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে শুরু করে। গত সপ্তাহ থেকে তা তীব্র আকার ধারণ করেছে।

সিঙ্গাপুরে একদিনে ৯৪২ আক্রান্তের রেকর্ড : সিঙ্গাপুরে কয়েক দিন ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯৪২ জনের শরীরে করোনার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। তবে এদের মধ্যে প্রায় সবাই ডরমিটরিতে বসবাসকারী অভিবাসী শ্রমিক বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। শনিবার সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন রোগীদের মধ্যে মাত্র ১৪ জন সিঙ্গাপুরের নাগরিক বা স্থায়ী অধিবাসী। বাকি সবাই বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শ্রমিক। এ নিয়ে সেখানে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫ হাজার ৯৯২ জন। এদিন নগর রাষ্ট্রটিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৯৫ বছর বয়সী একজন। এ নিয়ে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ জন।

জাপানে ১০ হাজার ছাড়াল আক্রান্ত : জাপানে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। দেশটির গণসম্প্রচার সংস্থা এনএইচকে এ তথ্য দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেও সংক্রমণ দমানো যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে এখন জাপানে আক্রান্ত ১০ হাজার ৯৮ জন, মৃত্যু ১৯০ জনের। টোকিওর বন্দরে নোঙর করা প্রমোদতরী ডায়মন্ড ক্রুসে কোয়ারেন্টিনে থাকা করোনা রোগীদের এ হিসাবে যুক্ত করা হয়নি। জাপানে করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে রাজধানী টোকিও। সেখানে ২৯৭৫ জনের করোনা শনাক্ত করা হয়েছে।

ভারতে নৌবাহিনীর ২১ সদস্য আক্রান্ত : ভারতীয় নৌবাহিনী তাদের ২১ সদস্যের দেহে প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাস শনাক্তের খবর নিশ্চিত করেছে। মুম্বাইয়ের আইএনএস আঙ্গর ঘাঁটির এ সদস্যদের বেশিরভাগের শরীরেই কোনো উপসর্গ ছিল না।

শুক্রবার সকালে এক বিবৃতিতে দেশটির নৌবাহিনী জানায়, আক্রান্তরা আইএনএস আঙ্গরের যে ব্লকে থাকতেন সেখানকার সবাইকে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। এদিকে শনিবার রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত ভারতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১৪ হাজার ৭৯২ জন, মৃত্যু হয়েছে ৪৮৮ জনের। এর মধ্যে মহারাষ্ট্রেরই ৩ হাজার ৩২৩ জন আক্রান্ত। সেখানে মৃত্যু হয়েছে ২০১ জনের। আক্রান্তের সংখ্যা বিবেচনায় মুম্বাই ভারতের শহরগুলোর মধ্যে সবার উপরে। এর মধ্যে এশিয়ার বৃহত্তম বস্তি ধারাভিতেই আক্রান্তের সংখ্যা ১০০ পেরিয়ে গেছে।

সীমান্ত খুলে দিতে চান ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট : করোনাভাইরাস মহামারীতে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে সীমান্ত খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো। আর এ সীমান্ত খুলে দেয়ার কারণে করোনা পরিস্থিতি খারাপ হলে তার দায় নিজের ওপরই বর্তাবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এর আগে, করোনাভাইরাসের পরিস্থিতি সামলাতে লকডাউনের মতো কৌশল নিয়ে মতবিরোধের জেরে বৃহস্পতিবার দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বরখাস্ত করেন কট্টর ডানপন্থী এ প্রেসিডেন্ট।

ইতালিতে ফের বেড়েছে মৃত্যু : ইতালিতে আবার বেড়েছে করোনায় মৃতের সংখ্যা। শুক্রবার দেশটিতে মারা গেছেন ৫৭৫ জন। এর আগের দিন মারা যান ৫২৫ জন। ফলে আগের দিনের তুলনায় মৃতের সংখ্যা এদিন বেড়েছে ৫০। দেশটিতে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ২২ হাজার ৭৪৫ জন। আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৭২ হাজার ৪৩৪ জন।

আক্রান্ত-মৃত্যু বাড়ছে মেক্সিকোতে : মেক্সিকোতে প্রথমদিকে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা কম থাকলেও এখন সেখানে আক্রান্ত ও মৃত্যুর পাল্লা ভারি হচ্ছে। দেশটিতে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মেক্সিকোর স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুক্রবার নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে আরও ৫৭৮ জন। ফলে দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ৮৭৫ এবং মৃত্যু ৫৪৬ জনের। দেশটির স্বাস্থ্য উপমন্ত্রী হুগো লোপেজ গ্যাটেল বলেন, দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে দেশের প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শীর্ষে ইন্দোনেশিয়া : দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর শীর্ষে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। দেশটিতে এ পর্যন্ত করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৩৫ জন। আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ২৪৮। তবে ইতোমধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৬৩১ জন।