চাকরি করেন অফিস সহকারীর। অথচ চলাফেরা করেন দামি প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে বাড়ি-জমি করেছেন, তুলেছেন বিলাসবহুল ভবন। মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার ও কয়েকটি ট্রাকের পাশাপাশি দামি একাধিক মোটরসাইকেলেরও মালিক তিনি। কোটি টাকা দিয়ে ডিলারশিপ নিয়েছেন বসুমতি টাইলস ও টাইলস ক্লিনারের। ছেলেকে পড়াচ্ছেন ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিদেশ সফরও করেন অহরহ। এত কিছু করতে পারার কারণ জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষর জাল করে প্রায় চারশ’ অস্ত্রের লাইসেন্স বিক্রি করে তিনি কোটিপতি বনে গেছেন।
এমন ’কীর্তিমান’ মানুষটি হলেন রংপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের জিএম শাখার অফিস সহকারী শামসুল

ইসলাম। রংপুর শহরের খোর্দ্দতামপাট সরেয়ালতল এলাকায় একটি বিলাসবহুল বাড়িতে বসবাস তার। তবে দুটি মামলার কারণে বর্তমানে তিনি পালিয়ে আছেন। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলা স্থানান্তরের পর তারাও মাঠে নেমেছে শামসুলের অবৈধ সম্পদ ও সম্পর্ক উদ্ঘাটন করতে।

এ ব্যাপারে রংপুরের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, ’জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষর জাল করে অফিস সহকারী শামসুল ইসলাম অস্ত্রের লাইসেন্স দিয়েছেন। তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ বিষয়ে মামলাও হয়েছে।’ তিনি বলেন, ’বিষয়টি তদন্তের জন্য কমিটি হয়েছে। অফিসের অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাকেও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।’

দুদক রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মোজাহার আলী সরকার জানান, আদালতে আবেদন করে সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে শামসুল ইসলামের বাড়িতে তল্লাশি করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

রংপুরের জেলা প্রশাসক কার্যালয়, দুদক ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৭ সাল থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে জিএম শাখার অফিস সহকারী শামসুল ইসলাম জিএম শাখা থেকে জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে প্রায় চারশ’ অত্যাধুনিক অস্ত্রের লাইসেন্স বিক্রি করেন। এসব লাইসেন্সের বিপরীতে দেওয়া ঠিকানাও ভুয়া। এমনকি লাইসেন্স পাওয়ার আগে দেওয়া গোয়েন্দা ও পুলিশের ক্লিয়ারেন্সও জাল করা। এ রকম একেকটি লাইসেন্স বাবদ শামসুল নিয়েছেন পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা। এভাবে কোটিপতি হয়ে গেছেন তিনি। বিষয়টি জানাজানি হলে এ ঘটনায় জিএম শাখার অফিস সহকারী শামসুল ইসলাম ও পিয়ন পান্নু মিয়ার নামে গত ১৮ মে মামলা করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিন্টু বিশ্বাস। মামলাটি দুদকে স্থানান্তর করার পরপরই তারা শামসুলকে গ্রেফতারে মাঠে নামে। অভিযোগ উঠেছে, এ ঘটনার সঙ্গে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার বেশ কয়েকজন আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবসায়ীসহ প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। অত্যাধুনিক এসব আগ্নেয়াস্ত্রের অধিকাংশেরই এখন হদিস মিলছে না। জেলা প্রশাসন শামসুল ইসলামের অফিসের আলমারি ভেঙে সাত লাখ টাকা, বিভিন্ন ব্যাংকে ১১ লাখ টাকার এফডিআর, দুই লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং ১৫টি ভুয়া লাইসেন্স জব্দ করা হয়েছে।

গত শনিবার নগরীর খোর্দ্দতামপাট সরেয়ারতল এলাকায় জিএম শাখার অফিস সহকারী শামসুল ইসলামের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পাঁচতলার ভিত্তি দিয়ে একটি বিলাসবহুল তিনতলা বাড়ি করেছেন তিনি। স্থানীয় প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম জানান, এটি নির্মাণে আনুমানিক খরচ হয়েছে ১০ কোটি টাকা। এর পাশে একতলার একটি বাড়িও রয়েছে তার।

এলাকাবাসী রফিকুল ইসলাম ও হাফিজুর রহমান জানান, কিছু দিন আগে শামসুল ইসলাম রংপুর নগরীর তামপাট মধ্যপাড়া এলাকায় এক কোটি টাকা দিয়ে এক একর জমি কিনেছেন। কোটি টাকা দিয়ে তিনি তার স্ত্রী মায়া বেগম ও ছেলে মাসুদ রানার নামে বসুমতি টাইলস ও টাইলস ক্লিনারের ডিলারশিপ নিয়েছেন।

প্রতিবেশী আজগর আলী ও শাম্মী আক্তার জানান, অফিস সহকারী শামসুল ইসলামের বাবা একসময় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ছিলেন। তিনি কৃষিকাজ করে সংসার চালালেও শামসুল যেন আলাদিনের চেরাগ পেয়েছেন। রংপুরে বাড়ি-গাড়ি-জমি করার পাশাপাশি ঢাকায় ফ্ল্যাট-বাড়ি কিনেছেন। প্রায়ই তিনি বিদেশ সফর করেন।

তবে শামসুল ইসলামের বিরুদ্ধে তোলা বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করে তার বাবা শফিল উদ্দিন বলেন, ’ঢাকায় ব্যবসায়িক ডিলারশিপ নেওয়ার ঘটনায় ঝামেলার কারণে একটি চক্র আমার ছেলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে নানাভাবে হয়রানি করছে।’ অনেক কষ্ট করে ছেলেমেয়েদের তিনি মানুষ করেছেন বলে দাবি করেন শফিল উদ্দিন।

শামসুল ইসলামের বাড়ি সরেজমিন পরিদর্শনের সময় তার শয্যাশায়ী স্ত্রী মায়া বেগমও স্বামীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, তাকে ফাঁসানো হয়েছে। তিনি এসবের সঙ্গে জড়িত নন। তিনি জানান, তার স্বামী কোথায় রয়েছে, তাও জানেন না তিনি। এর বেশি কোনো কথা বলতে তিনি রাজি হননি। bangla.moralnews24