কবি রফিক অাজাদ তাঁর কবিতায় বলেছেন, ’ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো’।অার অাদর্শ বিপণীর সামনে জ্যোৎস্না বিলাস করতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়া মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এই পথ শিশুদের বিদ্রোহী কণ্ঠ যেন বলে উঠছে, ’ভাত দে হারামজাদা, নইলে গাঁজা খাবো’।অার অামরা তাঁদের বিদ্রোহী কণ্ঠকে অারো দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়ে বলছি, ’গাঁজা খা হারামজাদা, নইলে লাথি দিবো’।অাজ সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে ধানমন্ডির ঝিগাতলা বাসস্ট্যান্ডের যাত্রী ছাউনির কাছ থেকে এই ছন্নছাড়া পথশিশুদের ঘুমন্ত অবস্থায় ক্যামেরা বন্দী করে ফেলি।

কবি রফিক অাজাদ ’ভাত দে হারামজাদা’ কবিতাটি লিখেছেন তখন, যখন বাংলাদেশের ইতিহাসের চরমতম দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ লোক মৃত্যুবরণ করছিল, নগ্ন ড্রেনে কুকুর এবং মানুষ খাবারের উচ্ছিষ্ট নিয়ে কামড়াকামড়ি করছিল।অার এখন তো বাংলাদেশ ডিজিটাল হয়েছে।সারাদেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে।সরকার কর্তৃক মানুষের বিনোদনের জন্যে নতুন নতুন পার্ক স্থাপন করা হচ্ছে।রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে টয়লেট পর্যন্ত সবজায়গায় বিনামূল্যে ওয়াফাই সংযোগ দেওয়া হচ্ছে যাতে কোনো মানুষ ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়।এই ধরণের হাজারো মহৎ উদ্যোগের কারণে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ এখন রুল মডেল।এ অামাদের বিরাট সাফল্য।

এখন যদিও দেশে দুর্ভিক্ষ নেই।কিন্তু না খেয়ে খোলা অাকাশের নিচে রাত কাটানো মানুষের কোনো অভাব নেই।কেউ খালি পেটের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে দুধের শিশুকে নিয়ে অাত্মহত্যা করছে।কেউ ডাস্টবিন থেকে পচা দুর্গন্ধযুক্ত খাবার খেয়ে কোনোরকমে শ্বাসপ্রশ্বাস চালনা করছে।অাবার কেউ দুই টাকার জন্য হাত পেতে লাথি খাচ্ছে।অন্যদিকে হাজারো অমানুষ লক্ষ টাকার ডাইনিং টেবিলে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা চিবোচ্ছে মুরগীর রোস্ট, খাসির রেজালা, আরো কত কি ! আবার আমার মতো কেউ কেউ শাকান্ন দিয়ে উদরপূর্তি করে অন্যের দু:খে ’আহা-উহু’ করছে সারাক্ষণ, কখনো কখনো দু’এক ফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়ছে কালক্রমে। ছা-পোষা নিম্ন মধ্যবিত্তের এই একটাই সম্বল, অল্পতে বাঁধ ভাঙ্গে দু’নয়নের জল।সেই জলে সাগর হয় না, বড়জোর দিঘী হয় আর তাতে নিজেরাই ডুবে মরে।

ক্ষুধা এমনই একটি জৈবিক চাহিদা বা প্রতিক্রিয়াশীল মন-শারীরিক আবেগ যা তখন পৃথিবীর সমস্তকিছুকেই অসংলগ্ন, মিথ্যা, বানোয়াট গল্পের মত মনে করিয়ে দেয়।তখন যে কোনো অখাদ্যকে খাদ্য বলে মনে হয়।ক্ষিধার জ্বালা মেটানোর জন্য মানুষ যেকোনো কিছু করতে পারে।এই পথ শিশুদের মতো হাজারো শিশু খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, বাসস্থান ও চিকিৎসাসহ সব ধরণের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে ধীরে ধীরে উগ্র হয়ে উঠে।তখন গাঁজা থেকে শুরু করে বাবা পর্যন্ত সব ধরণের অখাদ্যকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে নেয় এবং যে কোনো ধরণের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে এক সময় দেশদ্রোহী হয়ে উঠে।অামি এখানে শুধু প্রধান মৌলিক অধিকার খাদ্যের অভাবের মধ্য দিয়ে সব ধরণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া মানুষের কষ্টের অবস্থা বুঝাতে চেয়েছি।কারণ খাদ্যের অভাব ঠিকভাবে পূরণ হলে অন্যান্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার প্রশ্নই উঠে না।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বলেছেন, ’ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’।
কবি যদি অাজ বেঁচে থাকতেন তবে সুযোগ পেলে তাঁকে অবশ্যই জিজ্ঞেস করতাম এই নিদারুণ যন্ত্রণাটার এমন কাব্যিক রূপায়ন তিনি কি ভরাপেটে করেছিলেন নাকি খালিপেটে।বলা হয়ে থাকে খালিপেটে সাহিত্য লিখা যায় না।’A hungry man is an angry man’- এই কথা অামিও বিশ্বাস করি কিন্তু অপ্রিয় সত্য হলো এখনও পদ্য লেখার সময় হয় নি।দেশজুড়ে এখনও অসংখ্য দরিদ্র মানুষের হাহাকার, ক্রন্দন ও অার্তনাদ চলছে।অগণিত মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মরছে অনাহারে প্রতিনিয়ত।বিক্রি করে দিচ্ছে দেহ, সততা ও মূল্যবোধ শুধু দু’মুঠো ভাতের জন্য।বারোয়ারি ডাস্টবিনে ঘেঁটে চলেছে উচ্ছিষ্ট চৌরাস্তার মোড়ের পাগলটাও।তাঁরও যে খিদে লাগে ! বড্ড বেশি।
theyccnews