একটি গরুর ক্রয়মূল্য ৪০ হাজার। এ গরু কসাইখানায় পৌঁছাতে ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হয় ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা। সাথে পরিবহন খরচ, খাবার খরচ এবং দোকান ও স্টাফখরচ যুক্ত হয়ে দাম দাঁড়ায় ৮০ হাজার। এসব কারণে লালন-পালনকারী কৃষক দাম না পেলেও ভোক্তাদের গরুর গোশত খেতে হচ্ছে ৪৫০ টাকাদরে। এভাবেই পথে পথে চাঁদাবাজি আর অনিয়ম-অব্যবস্থাপনায় প্রতি কেজি খাসির গোশত গ্রাহককে কিনতে হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায়।
ফলাফল খুবই স্বাভাবিক। বিক্রি কমে গেছে, কমেছে লাভের পরিমাণ। নিতান্ত প্রয়োজন না হলে সাধারণ মানুষ গরু-খাসির গোশত খাওয়া বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে পথে বসার উপক্রম হয়েছে হাজার হাজার গোশত ব্যবসায়ীর। বাধ্য হয়ে রাজধানী ঢাকার গোশত ব্যবসায়ীরা চার দফা দাবিতে ধর্মঘট পালন করছেন গত সোমবার থেকে। প্রথমাবস্থায় ছয় দিনের কথা বলা হলেও দাবি মানা না হলে এ ধর্মঘট অনির্দিষ্টকাল করার এবং সারা দেশে সম্প্রসারণের চিন্তাভাবনা করছেন তারা।
ব্যবসায়ীদের ডাকা ধর্মঘটের কারণে রাজধানী ঢাকার ১৮২টি কাঁচাবাজার এবং পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাঁচ শতাধিক গোশতের দোকান বন্ধ রয়েছে। বাজারগুলোতে গরু ও ছাগলের গোশত পাওয়া যাচ্ছে না। সুপার শপগুলোতেও গোশত বিক্রি বন্ধ রয়েছে। গরু-খাসির অভাবে হোটেল রেস্তোরাঁগুলোয় বিক্রি কমে গেছে। অনেক পরিবার তাদের নির্ধারিত অনুষ্ঠান পিছিয়ে দিচ্ছে। বিরানি-তেহারির দোকানগুলোয় লাল বাতি জ্বলার অবস্থা। কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঢাকার বাইরে থেকে গরু কিনে এনে জবাই করলেও এ সংখ্যা খুবই কম। বিশেষ প্রয়োজনে ঢাকার বারে জবাই করা গরু-ছাগলের কিছু গোশত নিজস্ব পরিবহনে ঢাকায় ঢুকলেও এমন উদাহরণ নিতান্তই হাতে গোনা বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর রাজারবাগে অবস্থিত লিভিং-ইন রেস্টুরেন্ট ও পার্টি সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহসিন কবীর সরকার নয়া দিগন্তকে বলেন, টানা ধর্মঘটে আমাদের ব্যবসা খুব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বেচাকেনা অর্ধেকে নেমে এসেছে। অনেকে নির্ধারিত অনুষ্ঠান পিছিয়ে দিচ্ছেন। আবার অনেকে দিন-তারিখ ঠিক করেও পরিস্থিতি দেখার নামে হল বুকিং দিচ্ছেন না। কোনো কোনো আয়োজক নিজ উদ্যোগে ঢাকার বাইরে থেকে গরু-খাসির গোশত এনে দিচ্ছেন বলেও জানান মহসিন সরকার। এ দেশের মানুষ অনুষ্ঠান বলতে গরু-খাসিই বোঝেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, সরকারের উচিত বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা।
অতিথি আপ্যায়ন ব্যাহত
মেয়ের জন্মদিনে প্রতিবারের মতো গতকালও আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবদের বাসায় দাওয়াত দিয়েছিলেন স্বপ্না-সাগর দম্পতি। কিন্তু অতিথি আপ্যায়নের জন্য বাজার করতে গিয়ে মাথায় বাজ পড়ার অবস্থা তাদের। ভূরিভোজের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান গরু ও খাসির গোশত কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকটি কাঁচাবাজার ও সুপার শপ ঘুরে হতাশ সাগর জানালেন, শেষ পর্যন্ত গরু-খাসি ছাড়াই মেয়ের জন্মদিন পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। বিকল্প হিসেবে মুরগির একাধিক পদ এবং কয়েক প্রকারের মাছ কিনলেও অতৃপ্তি থেকে গেছে। ত্যক্ত-বিরক্ত সাগরের স্বগোতোক্তি, ’ধর্মঘটের আর সময় পেল না!’।
চার দফা দাবিতে বাংলাদেশ গোশত ব্যবসায়ী সমিতির আহ্বানে চলমান ধর্মঘটে স্বপ্না-সাগর দম্পতির মতো বেকায়দায় পড়েছেন অনেক ভোজনরসিকই। টানা ছয় দিনের ধর্মঘটের গতকাল ছিল চতুর্থ দিন। এখন পর্যন্ত দাবি পূরণে সরকার পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় আগামী শনিবারের পর থেকে সারা দেশেই ধর্মঘট পালনের হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিদিনই তারা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সভা সমাবেশ করছেন। যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন সারা দেশের ব্যবসায়ীদের সাথে।
তবে সমস্যা সমাধানের আপাতত কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না জানিয়ে বাংলাদেশ গোশত ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, গাবতলী গরুর হাটে বেপরোয়া চাঁদাবাজির কথা আমরা গত এক বছর ধরে সরকারকে জানিয়ে আসছি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আমাদের কয়েক হাজার অভিযোগ জমা আছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসিছি, দাবি না মানলে আমরা আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো। কিন্তু সরকার আমাদের দাবির প্রতি মোটেই কর্ণপাত করছে না। আজ শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, চার দফা দাবি না মানলে আমরা একযোগে সারা দেশে ধর্মঘট ডাকতে বাধ্য হবো।
কী আছে চার দফায়
চাঁদাবাজি বন্ধের বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলেও বাংলাদেশ গোশত ব্যবসায়ী সমিতি ধর্মঘট পালন করছে চার দফা দাবিতে। সমিতির চার দফা সম্পর্কে এর সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম বলেন, আমাদের প্রথম দাবি, ৪০ হাজার টাকার গরু কসাইখানায় যাওয়া পর্যন্ত যে ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা চাঁদাবাজি হয় তা বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে খাজনা আদায়ে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে গাবতলী গরুর হাটের ইজারাদাররা তা মানছেন না। সরকার গরুপ্রতি ৫০ টাকা ও মহিষপ্রতি ৭০ টাকা ইজারা নির্ধারণ করলেও ইজারাদারা তা মানছেন না। ইজারাদাররা কখনো ৫ হাজার টাকা, কখনো ২ হাজার টাকা আবার কখনো ২০০ টাকাও নেন। তিনি বলেন, গরু ব্যবসাকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে কোটি কোটি টাকা পাচার করছে। তারাই মূলত বাজারকে অস্থির করছে। তাই অবৈধ হুন্ডি বন্ধ করা আমাদের দ্বিতীয় দফা দাবি। আর তৃতীয় দফা হলো চামড়া সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প নগরী সাভারে স্থানান্তরের অজুহাতে চামড়া শিল্পমালিকরা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। আগে আমরা যে চামড়া তিন হাজার টাকায় বিক্রি করতাম এখন তারা সিন্ডিকেট করে এক হাজার টাকার বেশি দাম দিতে চায় না। এ সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। আর চতুর্থ দফা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে। করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তাকে চাঁদাবাজদের দোসর আখ্যা দিয়ে তাদের পদত্যাগ দাবি করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।
 




































nayadigantaonline