মানুষের অনেক রকমের শখ থেকে। অনেকের শখ থাকে ঘুরে বেড়ানো। তেমনই কাজী আসমা আজমেরীরের শখ ঘুরে বেড়ানো। এই মেয়ের গ্রামের বাড়ি খুলনায়। তিনি বিশ্বের ১১৫টি দেশে ঘুরে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়েছেন। এরপর কয়েক দিন আগেই তিনি দেশে ফিরেছেন। তিনি তার পাসপোর্ট হারান, জেল খানায় থাকে। এমনকি না খেয়ে থেকেছেন এরপরও বাংলাদেশের পাসপোর্ট হাতে পৃথিবীর পথে পথে ঘুরার শখ কাটেনি। তিনি বলেন, বিশ্ববাসীকে আমি দেখিয়েছি, বাংলাদেশের নারীরাও পারে। এবার তিনি বিভিন্ন বিষয়ে গনমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন।


ইবনে বতুতার রোমঞ্চকর ভ্রমণকাহিনি জানার পরই ভ্রমণের প্রতি একটা মোহ তৈরি হয় কাজী আসমা আজমেরীর। নারী পরিচয় ও ভাষার প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে শুরু করেন দুনিয়া চষে বেড়ানো। প্রথম ভ্রমণটা শুরু করেছিলেন অল্প কিছু জমানো টাকা আর অব্যবহূত কিছু গয়না বিক্রি করে।



থাইল্যান্ড দিয়ে শুরু

আসমা আজমেরী প্রথম ২০০৭ সালে থাইল্যান্ডে যান। এরপর ২০০৯ সালে নেপাল। নেপালে যাওয়ার আগে ২৫টি দেশ ভ্রমণ করা এক বন্ধুর মা তাঁকে বলেছিলেন, ’বিশ্বভ্রমণ কোনো নারীর পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ নারীরা দুর্বল।’ ওই কথায় অপমানিত হয়েই আসমা তাঁর ভ্রমণযাত্রা শুরু করেন। বললেন, ’এটি আমাকে আঘাত দিয়েছিল, কারণ আমি জানি, আমি দুর্বল নই। বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিলাম যে বাংলাদেশি নারীরাও পারে। তারা দুর্বল নয়।’



জেলও খেটেছেন

২০১০ সালে ভিয়েতনাম গিয়েছিলেন, ইচ্ছা ছিল সেখান থেকে কম্বোডিয়া যাবেন; কিন্তু ইমিগ্রেশনের লোকেরা তাঁর রিটার্ন টিকিট না থাকায় এবং বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেখে তাঁকে সে অনুমতি দেয়নি। সে দেশের ইমিগ্রেশন তাঁকে ২৩ ঘণ্টা জেলে বন্দি করে রাখে। বললেন, ’সেদিন আমি খুব কান্নাকাটি করেছিলাম। ওই ২৩ ঘণ্টা জেলে থাকার সময়ই আমি চিন্তা করলাম, আমাকে এমন কিছু করতে হবে, যাতে বাইরের মানুষ বাংলাদেশের পাসপোর্টকে সম্মানের চোখে দেখবে, বাংলাদেশিদের হয়রানি করবে না।’



ভাষা বাধা হয়নি

দুনিয়া ঘুরে বেড়াবার সময় ভাষা তাঁর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। যোগাযোগ করার চিহ্ন এবং বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন। আসমা আজমেরী রেড ক্রস ও রোটারির মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। যেখানেই ভ্রমণে যান, সামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়েন।



প্রথমে কোথায় যান?

কোনো দেশ ভ্রমণ শুরুর আগে প্রথমে সে দেশের জাদুঘরে যান। বললেন, ’এটি আমাকে সে দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।’

বিশেষ দেশ

কাজী আসমার কাছে প্রতিটি দেশই সুন্দর। ’লাইফ অব পাই’ চলচ্চিত্রটি দেখার পর তিনি ভারতের পুডুচেরি ঘুরে দেখতে চেয়েছিলেন; এবং সেখানেও যান। তবে বিশেষভাবে বলতে হবে তুর্কমেনিস্তানের কথা। কারণ তিনি এই দেশটি ভ্রমণের মাধ্যমে শততম দেশ ভ্রমণ করেছেন। বললেন, ’বলিভিয়াও খুব ভালো লেগেছে। দরিদ্র দেশ হলেও সেখানে ভিখারি নেই।’



অনাহারে থেকেছেন

খারাপ আবহাওয়ার কারণে একবার ২৪ ঘণ্টা আটকে ছিলেন সাইপ্রাসে। আর একবার তো ইতালির মিলানে গিয়ে পাসপোর্টসহ অন্য সব জিনিস হারিয়ে বসে ছিলেন। রাস্তায় অনাহারে সময় কাটিয়েছেন। বন্ধুবান্ধব ও দূতাবাসের কাছ থেকে সহায়তা না পাওয়া পর্যন্ত এভাবেই দিন কাটান।



অনিরাপদ বোধ করিনি

তিনি নারী হয়েও একাকী ভ্রমণে কখনো অনিরাপদ বোধ করেননি। তিক্ত একটি অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে বললেন, ’বিভিন্ন দেশে একা ঘুরতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ভালো-মন্দের মুখোমুখি হয়েছি, শিখেছি। সেসব অভিজ্ঞতাই আমাকে গড়ে তুলেছে। তাই হয়তো বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্বের ১১৫টি দেশ ভ্রমণ করতে পেরেছি।’



শাড়ি নয়, টিকিট

ভ্রমণ নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন তরুণদের সঙ্গে। বললেন, ’আপনার ইচ্ছা আর ধৈর্য থাকলে, কোনো লক্ষ্যই অর্জনের বাইরে নয়।’ নতুন নতুন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য বিলাসী জীবনযাপন পরিহার করে চলেন। বললেন, ’আপনি আমাকে নতুন শাড়ির জন্য কেনাকাটা করতে দেখবেন না। আমি ওই টাকাটা নতুন জায়গায় ভ্রমণের জন্য টিকিট কিনতে ব্যয় করি।’



মেইড ইন বাংলাদেশ

বিশ্বভ্রমণে সব সময় দেশে তৈরি পোশাক পরে থাকেন। নিজের গায়ের পোশাকটি দেখিয়ে বললেন, ’এটিও বাংলাদেশের তৈরি।’



পাসপোর্টেই পরিচয়

দেশের পাসপোর্টেই নিজের পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। ইচ্ছা করলে ইউরোপীয় পাসপোর্ট নিতে পারতেন; কিন্তু তিনি তা করেননি। বললেন, ’বাংলাদেশ আমার দেশ, আমি চাই এ দেশকে মানুষ চিনুক। আমরা ভ্রমণপিপাসু এবং পর্যটক হিসেবেও যে কোথাও যেতে পারি সেটা দেখাতে চাই। গত মাসেই আমি ১১৫টি দেশ সফর শেষ করেছি, আমার চোখে এটা বাংলাদেশি পাসপোর্টের জয়।’



হাফ সেঞ্চুরি, সেঞ্চুরি

৫০তম দেশ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় ফুটবল দলের দেশ ব্রাজিলকে। ২০১৪ সালে ব্রাজিলেই বিশ্বকাপ হচ্ছিল। আমাজানের পাশ দিয়ে জলপথে তিন দিন বোটে করে মানাউস শহরে পৌঁছেছিলেন। সেই স্মৃতি এখনো মনে আছে। আর শততম দেশ হিসেবে ২০১৮ সালে তুর্কমেনিস্তানের অ্যাম্বাসেডরের আমন্ত্রণে আশখাবাদে গিয়েছিলেন আসমা আজমেরী। বললেন, ’শততম দেশ ভ্রমণ হিসেবে বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় রাশিয়া যেতে চেয়েছিলাম; কিন্তু ভিসা জটিলতায় তা আর হয়ে ওঠেনি। তুর্কমেনিস্তান ভ্রমণ সে কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে।’ আসমা আজমেরীর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুর্কমেনিস্তানের জাতীয় টেলিভিশন প্রচার করেছে। সেখানে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও তুর্কমেনিস্তানের সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলেছেন আসমা। বললেন, ’১০০ দেশ ভ্রমণের মাইলফলক আমার একার জয় নয়, এটি পুরো বাংলাদেশের জয়, বাংলাদেশি নারীদের জয়।’



’হাই বাংলাদেশ’

ভিনদেশের অনেকেই তাঁকে ’হাই বাংলাদেশ’ বলে ডেকে থাকেন। বললেন, ’হাই বাংলাদেশ ডাক যে আমি কত উপভোগ করি, তা তো বোঝাতে পারব না।’



কন্যাশিশুদের সাইকেল উপহার

আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের মধ্যে কারো কন্যাশিশুর জন্ম হলে সাইকেল উপহার দেন। ’মেয়ে বলে সাইকেলে চড়তে পারতাম না। মেয়ে বলে সাইকেল চালাতে পারবে না—এটা তো হতে পারে না’ বলেন তিনি।

উল্লেখ্য, কাজী আসমা আজমেরী জন্ম গ্রহণ করেন খুলনা শহরে। তিনি তার বাবা-মার বড় সন্তান। তার বাবার নাম কাজী গোলাম কিবরিয়া এবং তার মায়ের নাম কাজী সাহিদা আহমেদ। তিনি ইকবালনগর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর তিনি খুলনা মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তারপর তিনি ঢাকার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক করেন এবং ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে হিউম্যান রিসোর্সে এমবিএ করেন। তিনি একটি বেসরকারি কম্পানিতে কাজ করার মাধ্যমে তার ক্যারিয়ার শুরু করেন। বর্তমানে তিনি নিজেই একটি ট্রাভেল এজেন্সি পরিচালনা করছেন।