বিদেশে অর্থ পাচারকে একটি বড় ধরনের অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এটির সম্ভাব্য খারাপ অর্থনৈতিক দিক রয়েছে যা একটি দেশের অর্থনীতিকে শেষ করে দেয়, এর একটি সামাজিক পরিণতি রয়েছে যা কখনই দেশের জন্য সহায়ক নয়। অবৈধ ব্যবসায়ী, চোরাচালানকারী, অবৈধ ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ সরকারী কর্মকর্তা এবং অন্য যারা এই অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত তাদের অপরাধমূলক উদ্যোগ পরিচালনা ও প্রসারিত করার এটি একটি এভেন্যু। এটি সরকারী রাজস্ব আদায়েও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে এবং সরকারকে যথাযথ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করে। আমাদের দেশে এখন অনেকটা অহরহ ঘটছে এই অর্থ পাচারের ঘটনা। এবার অভিযুক্ত হলেন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল দেশ টিভির পরিচালক আরিফ হাসান।
যিনি বিদেশে পাচার করা টাকায় কানাডায় বাড়ি করার পাশাপাশি দেশে-বিদেশে, নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, ৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারে টরন্টোতে বাড়ি কিনেছেন আরিফ। ৩৩৫ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি করেছেন। এছাড়া আরিফ ও তার বাবার নামে ১২৮ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক।

দুদকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা গনমাধ্যমকে বলেন, ’আরিফ হাসানের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমে তার মালিকাধীন হাসান টেলিকমের ৩৩৫ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির তথ্য মিলেছে। এছাড়া আরিফ হাসান, তার স্ত্রী এমিলি ফয়েজের নামে কানাডার টরেন্টোর নর্থ ইয়র্কের ৮২ হলিউড অ্যাভিনিউয়ে একটি বাড়ি কেনার তথ্য দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। জাল-জালিয়াতি করে আয় করা টাকায় বাড়িটি কেনা হয়েছে। এর পাশাপাশি আরিফ হাসান এবং তার বাবা আবদুল আজিজের নামে ১২৮ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই সম্পদের বৈধ উৎস সম্পর্কে কোনও তথ্য জানাতে পারেননি তারা।’

দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়ে জানতে আরিফ হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি গনমাধ্যমকে বলেন, ’বাবা অসুস্থ। এ বিষয়ে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই আমি।’

অবৈধ সম্পদ অর্জন, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, অর্থপাচার আর সিন্ডিকেট পরিচালনার মাধ্যমে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে আরিফ হাসানের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি হয় গত বছরের ১৮ নভেম্বর। ওই মাসেই তার ব্যাংক হিসাব জব্দ করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তখন আরিফ হাসানের সাউথ-ইস্ট ব্যাংকের মৌচাক শাখার ব্যাংক হিসাবে থাকা ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা জব্দ করা হয়।

আরিফ হাসানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) বরাবর পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ’দেশ টিভির পরিচালক আরিফ হাসানের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধ টাকা আদায় করে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দুদকে অনুসন্ধানাধীন আছে। জানা গেছে, তিনি দেশত্যাগ করে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সুষ্ঠু অনুসন্ধান পরিচালনার জন্য তার বিদেশে যাওয়া বন্ধ করা জরুরি।’

চিঠিতে আরিফ হাসানের জন্মস্থান কুমিল্লা এবং দু’টি ঠিকানা উল্লেখ করা হয়। তার বাবার নাম আবদুল আজিজ এবং মায়ের নাম মালেকা পারভীন। ঠিকানা দু’টি হলো বাড়ি-১৮/এ, রোড-৪৪, গুলশান উত্তর, ঢাকা-১২১২ এবং অ্যাপার্টমেন্ট-বি-৩/ডি, বাসা-১৫, পুরাতন ডিওএইচএস, বনানী।

বিশেষ পুলিশ সুপারের (ইমিগ্রেশন) কাছে চিঠিটি পাঠান দুদকের সহকারী পরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-১) মো. শফি উল্লাহ।

কানাডায় বাড়ি কিনেছেন আরিফ

দুদকের অনুসন্ধান সূত্র জানায়, আরিফ হাসান ৮২ হলিউড অ্যাভিনিউ, নর্থ ইয়র্ক (টরন্টো) ঠিকানায় বাড়ি কিনেছেন। বাড়িটি গেল বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর আরিফ হাসান, তার স্ত্রী এমিলি ফয়েজ ও সুফিয়া চৌধুরীর নামে হস্তান্তর হয়েছে। বাড়ি কেনার সময় আরিফ ও তার স্ত্রীর সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা সুফিয়া চৌধুরীকে অংশীদার করা হয়েছে। বাড়িটি কেনা হয়েছে ৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার (২৩ কোটি ৬৩ লাখ বাংলাদেশি টাকা) দিয়ে। বাড়িটি প্রাইভেট ডিলিংয়ের মাধ্যমে নগদে কেনা হয়েছে। এটি এখনও নির্মাণাধীন। ৬ হাজার স্কয়ার ফুট জায়গার ওপর নির্মাণাধীন বাড়িটির কাজ সম্পন্ন করতে খরচ করা হচ্ছে কমপক্ষে ১ মিলিয়ন ডলার।

আরিফের ঋণ জালিয়াতি

ন্যাশনাল ব্যাংক, মহাখালী শাখায় আরিফের মালিকানাধীন হাসান টেলিকমের নামে ৩৩৫ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি হয়েছে। ডাইরেক্ট হু হোম প্রকল্পের আওতায় ৪৭৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ওয়ার্ক পারমিটের বিপরীতে ন্যাশনাল ব্যাংকের মহাখালী শাখায় ঋণের আবেদন করা হয়। ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর ব্যাংকের পর্ষদ সভায় হাসান টেলিকমের অনুকূলে ২৭৫ কোটি টাকার ৫ বছর মেয়াদি ওভারড্রাফট (ওডি) ঋণ অনুমোদন করা হয়। ২৯ নভেম্বর গ্রাহকের চলতি হিসাবে ১০০ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়। পুরো টাকা ব্যাংকের বনানী ও দিলকুশা শাখা থেকে ১৯টি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। ২ ও ৩ ডিসেম্বর যথাক্রমে ১০০ কোটি এবং ৭৫ কোটি টাকা একইভাবে চলতি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। পরে একই ব্যাংকের দিলকুশা শাখা থেকে চেকের মাধ্যমে তা নগদে উত্তোলন করা হয়। চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি ঋণসীমা ২৭৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৩৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার আবেদন করেন আরিফ হাসান।

দুদক সূত্র জানায়, অনুসন্ধান এখনও শেষ হয়নি। ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৬ বার পাসপোর্ট পরিবর্তন করা আরিফ হাসানের জাল-জালিয়াতির আরও অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

সাধারণত অর্থ পাচারের প্রক্রিয়াটি তিনটি পর্যায়ে সম্পন্ন হয়: স্থান নির্ধারণ, স্তরকরণ এবং একীকরণ। স্থান নির্ধারণ প্রক্রিয়াটির প্রথম পর্যায়ে যা আর্থিক ব্যবস্থায় অবৈধ উপার্জন নিয়ে আসে। দ্বিতীয় পর্যায়ে লেয়ারিং নামে পরিচিত, একাধিক লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ সরানো বা আর্থিক ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত করা হয় যাতে এর খাঁটি উৎসটি লুকানো যায়। শেষ পর্যায়ে হ’ল সংহতকরণ, যার মাধ্যমে আর্থিক ব্যবস্থায় অবৈধ অর্থ বৈধ বলে মনে হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউশন অফ ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে মূলত চারটি আকারে চালিত হয় - চালানের ওপরে ও চালানের অধীনে, একাধিক চালান এবং মিথ্যা ঘোষিত পণ্য এবং সেবার মধ্যমে। অনেক কালো টাকাওয়ালা নকল এলসি খোলা বা ওভার চালানের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে অর্থ পাচার করছে।