সম্প্রতি দেশে চলমান শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে অনেক প্রভাবশালী নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এই শুদ্ধি অভিযান নিয়ে অনেক ব্যক্তি ভিবিন্ন বক্তব্য দিয়েছে। তবে দেশের সাধারণ জনগন এই শুদ্ধি অভিযানকে সধুবাদ জানিয়েছে। দেশের সকল জনগন এই অভিযান চলমান দেখতে চায়। এই অভিযানের মাধ্যমে সরকারের অনেক প্রভাবশালী নেতা ফেঁসে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন অবৈধ কাজে যে দলের লোক জড়িত থাক না কেন তাদের সবাইকে
গ্রেফতার করতে হবে।

সেলিম খান চাঁদপুর সদরের ১০নং লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি এক সময় রিকশা চালিয়ে অর্থ উপার্জন করতেন। তবে এখন তিনি প্রাডো ও র‌্যাভ-৪ গাড়িতে চলাফেরা করেন। তার রয়েছে বিশাল হুন্ডা বাহিনী। বর্তমানে তিনি চলাফের করে বিলাসী জীবন। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরুর পর সে কয়েক দিন পলাতোক ছিলেন।

জানা গেছে, তিনি চাঁদপুর শহরের কালীবাড়ির কাছে লাভলী স্টোরের জমি ২১ কোটি টাকা দিয়ে কিনেছেন।

শুধু চাঁদপুর নয়, তিনি সম্রাটের সহযোগী হিসেবে ঢাকাতেও বিলাসী জীবন গড়েছেন ।

তিনি সিনেমায় বিনিয়োগ করেছেন কয়েক কোটি টাকা। তিনি ঢাকায় নিজের বিলাসী জীবন ধরে রাখতে খালেদ, সম্রাট, সাঈদ ও আরমানের সাথে যোগ দিয়ে সিনেমার ব্যবসায় বিপুল পরিমান অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। শাপলা মিডিয়া নামে তার প্রতিষ্ঠান রয়েছে।





আমি নেতা হব, চিটাগাইঙ্গা পোলা নোয়া খাইল্যা মাইয়া, ক্যাপ্টেন খান, শাহেনশাহ, প্রেম চোর, একটা প্রেম দরকার ও বিক্ষোভ ছবি সেলিম খানের টাকায় বানানো। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ ছবির নায়ক সুপারস্টার শাকিব খান।

এছাড়া ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে আটক আরমানের প্রযোজিত দুটি ছবির নায়কও শাকিব খান। যার একটির (আগুন) শুটিং চলমান রয়েছে। জানা গেছে, সেলিম খান ৭টি ছবির পেছনে কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকা লগ্নি করেছেন। তবে সিনেমা সংশ্লিষ্টদের মতে, টাকার পরিমাণ আরো অনেক বেশি।

জানা গেছে, সেলিম খান আত্মগোপন থেকে ফের প্রকাশ্যে এসেছেন। তার দাপটে চাঁদপুরের মানুষ তটস্থ। কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না। ফলে তার সব অপকর্ম ঢাকা পড়ে আছে। তবে ভুক্তভোগীসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষ কৌশলে তার ফুলেফেঁপে ওঠার গল্প গণমাধ্যমে জানাচ্ছেন।

কয়েক বছরের ব্যবধানে সেলিম খানের অস্বাভাবিক সম্পদ এলাকাবাসীর কাছে রূপকথার গল্পের মতো।

গত দশ বছরে রিকশাচালক থেকে কীভাবে অঢেল সম্পদের মালিক হলেন- এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি গণমাধ্যমে বলেন, আমি চাঁদপুরের একটি স্থানীয় দৈনিকের সম্পাদক ও প্রকাশক। ’আমি একজন সম্মানীয় ব্যক্তি’। ৯ বছর একটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। পত্রিকার সম্পাদক- প্রকাশক হতে হলে লেখাপড়া থাকতে হয়- এমন প্রশ্ন শুনে তিনি উত্তেজিত হয়ে মামলা করারও হুমকি দেন।

ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ ব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কাজটি করছেন। এসব কাজে তার বিশাল বাহিনী ব্যবহার করে থাকেন। ফলে চাঁদপুরের নদীতীরবর্তী এলাকা ভাঙনের মুখে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড নিয়ন্ত্রিত বেড়িবাঁধ খাল দখল করে মাছ চাষ করছেন।

শাপলা মাল্টি মিডিয়া নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খুলে সিনেমায় কালো টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ঢাকার ক্যাসিনো ব্যবসাসহ তদবির বাণিজ্য করে তিনি এখন টাকার কুমির।

সরেজমিন তার সম্পদ অর্জনের অনেক অজানা কাহিনী জানা গেছে। এলাকার লোকজন জানান তিনি ফসলি জমি ভরাটের মাধ্যমে নষ্ট করছেন কৃষিজমি। মেঘনা নদী থেকে বছরের পর বছর বালু উত্তোলন করে চলেছেন।

নদীতে শত শত ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু তুলে বিক্রি করছেন। এর ফলে নদীভাঙন বাড়ছে। ঝুঁকির মুখে পড়েছে চাঁদপুর-হাইমচর রক্ষাবাঁধ। তবে তিনি অবৈধভাবে ব্যবসার কথা অস্বীকার করে সেলিম খান বলেন, ’সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে বালু উত্তোলন করি।’

এলাকাবাসী বলেন, চেয়ারম্যানের নিজের ইউনিয়নটি নদীর পাড়ে। সেখানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলে গরিব দুঃখীদের ফসলি জমি ও ভিটেবাড়ি নামমাত্র মূল্যে গ্রাস করে নিচ্ছেন। চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলে যাদের জমি নিয়েছেন তাদের মধ্যে স্থানীয় সুকা কবিরাজের বাড়িসহ প্রায় ২৫টি বাড়ির শতাধিক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। যে জমির শতাংশ এক লাখ টাকা সে জমি তিনি ৫-১০ হাজার টাকায় নিচ্ছেন। তিনি চাইলে জমি দিতেই হবে। না দিলে পরিণতি হবে ভয়াবহ।

অপরদিকে সম্রাটের সঙ্গে যোগ দিয়ে ঢাকা এবং আশপাশে নামে-বেনামে বিশাল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। সম্রাট ছাড়াও যুবলীগের খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, আরমান, ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাঈদসহ এ চক্রটির সঙ্গে মিলেমিশে নিজেকে অন্য প্রভাবশালীদের তালিকায় নিয়ে যান। নিজের মুখেই স্বীকার করেছেন কাকরাইলে তার চার তলা আলিশান বাড়ি রয়েছে। এছাড়া ডেমরায় তার ৬ তলা বাড়ি, নারায়ণগঞ্জের ভুইগড়, রাজধানীর হাতিরপুলসহ বিভিন্ন স্থানে বেনামি সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে।

সেলিম খানের বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন ও সাবেক সাখুয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান খান ওরফে মনা খাঁ বলেন, আমি যতটুকু জানি তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে তা সঠিক। তিনি এক সময় রিকশা চালাতেন। তার বিশাল বিত্তবৈভব নিয়ে আমাদের সবার মাঝে প্রশ্ন আছে। কীভাবে এত সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা এলাকার মানুষের কাছে বিস্ময়।

শত শত কোটি টাকার সম্পদের উৎস কী- জানতে চাইলে ১০নং লক্ষ্মীপুর মডেল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সেলিম খান বলেন, সম্পদ বলতে কাকরাইলে ঈশা খাঁ হোটেলের পাশে চার তলা একটি বাড়ি ছাড়া আমার আর কিছুই নাই। অন্য যেসব সম্পদের কথা বলা হচ্ছে তা ঠিক নয়।

রিকশাচালক থেকে কীভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন, এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, আমি কখনও রিকশা চালাইনি এ সংবাদ সত্য নয়। তার সাথে কথার এক সময় তাকে বলা হয় তার নাম
ক্যাসিনো তালিকায় রয়েছে তখন তিনি অবাক হয়ে যান। সম্রাটের সাথে সম্পর্কের কথা বললে তিনি জানান, আমি সম্রাটকে ভাল ভাবে চিনি না।

এদিকে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বিপুল সম্পদের বর্ণনা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, চেয়ারম্যান সেলিমের সম্পদের পরিমাণ শুনে আমার মনে হয়েছে সে অবৈধ ভাবে এই সম্পদ গড়েছেন। এটা অবশ্যই দুর্নীতির মাধ্যমে করা হয়েছে।দুর্নীতি দমন কমিশনের এখতিয়ার হয়ে যায় তদন্তের বিষয়টি। তাই আমরা সবাই চাই এ সম্পর্কে সঠিক তদন্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা নিবে।


উল্লেখ, চলমান শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে অনেক প্রভাবশালী নেতাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এরপর তাদেরকে রিমান্ডের নেয়ার মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের হয়েছে। দেশের সাধারণ জনগন চায় যারা এই অবৈধ কাজের সাথে জড়িত তাদের সবাইকে গ্রেফতার করা হোক।