গাজী সারোয়ার হোসেন বাবু ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা যুবলীগের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক। নব্বইয়ের দশকে তৎকালীন বিএনপির
টেপা বাবুর মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে আসেন। এরপর সোহরাওয়ার্দী কলেজ প্রথমে ছাত্রলীগ যোগ দেন তারপর যুবলীগে যোগ দেন। এরপরই এই নেতা অনেকটা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ২০০৮ সালের আগ প্রযন্ত তার নিজের মালিকানায় তেমন কোন সম্পদ ছিলো না।
তবে বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা।

বিভিন্ন রকম অনিয়ম ও অবৈধ কাজের মাধ্যমে সদরঘাটসহ আশপাশের সকলের কাছে যুবলীগ নেতা সারোয়া পরিচিত হয়ে যান। তাকে সবাই পিচ্চি বাবু নামে চেনে। সূত্রাপুরের হেমন্ত দাস রোডে নিজের ফ্ল্যাটে তিনি থাকেন।

বিভিন্ন মাধ্যমে জানা যায়, রাজধানীর পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকায় গ্রেটওয়াল মার্কেটে নিজের ১৫টি দোকান রয়েছে গাজী সারোয়ারের। বর্তমানে বাজার দর অনুযায়ী এর মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। এরপাশাপাশি এই নেতা ৪০টির মতো দোকান নিজের দখলে রেখেছেন।
এছাড়া যাত্রাবাড়ী এলাকার ৯৬/বি কাজলা সুতিখালপাড়ে ছয়তলা ভবন রয়েছে তাঁর। যার বাজার মূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। তাঁর পাঁচ কাঠা জমি রয়েছে যাত্রাবাড়ীর বিবির বাগিচা এলাকার দুই নম্বর গলির আফজাল মেটালের পাশে। এর বর্তমান বাজার মূল্য দেড় কোটি টাকার অধিক।

অভিযোগ আছে, অবৈধ কাজ ও অনিয়ম করে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। টাকা ও ক্ষমতার দাপটে তিনি এখন গ্রেটওয়াল মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি। সারোয়ারের বিরুদ্ধে একটি হাসপাতালের ক্রয় কমিটির সদস্য হয়ে টাকা মারা ও অন্য একটি হাসপাতালের জমি দখলের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

গত ২৩ সেপ্টেম্ব সরেজমিনে দেখা যায়, সদরঘাট লঞ্চঘাটের দিকে যেতে বাংলাবাজার পার হয়ে হাতের বাঁয়ে গ্রেটওয়াল মার্কেট। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর বেশ কয়েকজন দোকানি আড়ালে গিয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে চান। সবার সামনে কথা বললে নাকি বিপদ হতে পারে। মার্কেটের চারতলার কাপড়ের ব্যবসায়ী মিঠু মিয়া জানান, মার্কেটে সারোয়ারের অনেক দোকান থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৪০টি দোকান দখল করে নিজের মতো করে চালাচ্ছেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে পারে না।

মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, আন্ডারগ্রাউন্ডে সারোয়ারের বিশাল একটি তৈরি পোশাকের দোকান রয়েছে। দুটি দোকান একসঙ্গে করে এ দোকানটি করা হয়েছে। ওই দুটি দোকানের একটি তাঁর নিজের, অন্যটি দখল করা। নিচতলায় গিয়ে দেখা গেছে, ২৭ নম্বর দোকানটিও তাঁর দখলে। চারতলায় প্রায় ২০টি দোকানও তাঁর দখলে। এগুলোকে চার ভাগে ভাগ করে বড় দোকানের আকৃতি দেওয়া হয়েছে। দোকানগুলোর কর্মচারীরা দখল করে নেওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তাঁরা জানান, এখানে আগে ১৫-২০টির মতো দোকান ছিল। চারতলায় তাঁর নিজেরও রয়েছে কয়েকটি দোকান। মার্কেটের ছয়তলায় এক নারীর দোকান দখল করে মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির কার্যালয় করার নামে নিজের ব্যক্তিগত কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছেন।

মার্কেট ব্যবসায়ী সূত্রে জানা যায়, যুবলীগের এই নেতা মার্কেটের বিষয়ে যখন যা ইচ্ছা, তা-ই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। অন্যদের মতামতের কোনো তোয়াক্কা করেন না। গত কয়েক বছর ধরে বিদ্যুৎসহ কোনো সার্ভিসিং খরচই দেওয়া হয় না। কিছু বললে যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের ভয় দেখান। রমজান মাসে তাঁকে বাধ্যতামূলক চাঁদা দিতে হয়। জাতীয় যেকোনো দিবস উপলক্ষে চাঁদা হিসেবে বিপুল টাকা তোলা হলেও তার কোনো হিসাব সমিতির অন্য সদস্যরা জানতে চাইতে পারেন না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সূত্রাপুরের প্যারিদাস রোডের ৩৩/১ নম্বর বাড়ির পাশে একটি রিকশা গ্যারেজ রয়েছে। জায়গাটি সুমনা হাসপাতালের। কিন্তু যুবলীগ নেতা গাজী সারোয়ার দখল করে রিকশা গ্যারেজ করে ভাড়া দিয়ে রেখেছেন। যেখান থেকে প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার টাকা নিয়ে যায় তাঁর লোক। গ্যারেজের কয়েকজন টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এ সম্পর্কে সুমনা গ্রুপের ম্যানেজার ফেরদৌস আহমেদ গনমাধ্যমকে জানান, এই জায়গাটি যে হাসপাতালের তা সবারই জানা আছে। তবে
ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি সেখানে রিকশা গ্যারেজ করেছেন।

আরও জানা গেছে, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল হাসপাতালের ক্রয় কমিটির অন্যতম সদস্য এই যুবলীগ নেতা সারোয়ার। এমনকি তার বিরুদ্ধে হাসপাতালে রোগীদের মেডিক্যাল পণ্য এবং খাবার পণ্য কেনার ক্ষেত্রে দ্বিগুণ দাম দেখিয়ে ভাউচার করে অতিরিক্ত টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এই সকল অভিযোগের সম্পর্কে কথা বলতে গত ২৩ সেপ্টেম্বর গ্রেটওয়াল মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির অফিসে যেয়ে গাজী সরোয়ার হোসেন বাবুর সাথে যোগাযোগ করা যায়নি। তখন তার ওই অফিসে তালা দেয়া ছিলো। এরপর তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে ডায়াল করা হলে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে গত ১০ অক্টোবর এসএমএস পাঠিয়েও কোন রকম যোগাযোগ করা যায়নি।