পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে, রাজশাহীর আওতায় পরিচালিত হয় ১৪২টি ট্রেন। এর মধ্যে ৩৪টি ট্রেন পরিচালিত হয় ইজারা ভিত্তিতে
বেসরকারিভাবে। রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, সব মিলিয়ে বছরে তাদের লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এ লোকসান মূলত নিজেদের পরিচালিত ট্রেনেই হচ্ছে। অন্যদিকে ইজারার ভিত্তিতে বেসরকারিভাবে পরিচালিত ট্রেন থেকে লাভ করছে রেলওয়ে। তাদের হিসাবে, ইজারা দেওয়া ট্রেন থেকে বছরে লাভ হচ্ছে অন্তত ১৫ কোটি টাকা।

জানা যায়, রেলওয়ে পরিচালিত ট্রেনে লোকসানের অন্যতম কারণ দুর্নীতি। রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের নামে লুটপাটের কারণেও লোকসান গুনতে হচ্ছে রেলকে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে সূত্র মতে, রেল বিভাগের দুটি অঞ্চলের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চল, রাজশাহীর আওতায় মোট ১৪২টি ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে আন্ত নগর ট্রেন রয়েছে ৪৮টি, মেইল ট্রেন ৪৬টি, বিরতিহীন দুটি, আন্তর্জাতিক মৈত্রী এক্সপ্রেস চারটি ও লোকাল ট্রেন রয়েছে ৪২টি। এই ১৪২টি ট্রেনের মধ্যে রেলওয়ের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে ১০৮টি। আর ইজারার ভিত্তিতে বেসরকারিভাবে পরিচালিত হচ্ছে ৩৪টি। যেগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছে সেগুলোর বেশির ভাগই লোকাল ও মেইল ট্রেন। এগুলো সাধারণত লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা ট্রেন। মেইল ও লোকাল ট্রেনের যাত্রীরা টিকিট কাটতে চায় না বলে এগুলো লিজ দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার দপ্তর সূত্র মতে, এই বিভাগের আওতায় ১৪২টি ট্রেন থেকে বছরে আয় হয় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। লোকসানের পরিমাণ এর প্রায় অর্ধেক। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এই বিভাগের ট্রেনগুলো থেকে আয় হয়েছে ৪৮০ টাকার কিছু বেশি। কিন্তু লোকসান হয়েছে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। চলতি মে ও জুন মাসে আরো প্রায় ১০০ কোটি টাকা আয় হবে, যা থেকে গড়ে অন্তত ৫০ কোটি টাকা লোকসানও হবে।

রেল বিভাগ বলছে, সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা আয় হলে এর অর্ধেক লোকসান হয় বলে ধরে নেওয়া হয়। এমনটিই হয়ে আসছে বছরের পর বছর ধরে। তবে সাম্প্রতিককালে লোকসানের পরিমাণ কিছুটা কমে এসেছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ইজারা দেওয়া ৩৪টি ট্রেন থেকে মাসে রেল বিভাগের লাভ হয় এক কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার ৯১৪ টাকা। সেই হিসাবে বছরে ১৪ কোটি ৭০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৮ টাকা লাভ হচ্ছে পশ্চিমাঞ্চলের এই ট্রেনগুলো থেকে। এসব ট্রেন চার বছর মেয়াদে ইজারা দেওয়া হয়। ইজারাদার প্রতি ১০ দিন অন্তর টাকা দেয়।

আর অন্য ১০৮টি ট্রেনে বছরে আয় হচ্ছে প্রায় ৫০০-৫৫০ কোটি টাকা। কিন্তু ১০৮টি ট্রেনে এই আয় করতে গিয়েই লোকসান গুনতে হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকার মতো।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে, রাজশাহীর অতিরিক্ত প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম বলেন, ’লিজ দেওয়া ৩৪টি ট্রেন থেকে বছরে প্রায় অর্ধেক লাভ হচ্ছে। কিন্তু লিজ ছাড়া রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ১০৮টি ট্রেন থেকে বছরে প্রায় অর্ধেক বা তার কিছু টাকা বেশি লোকসান হচ্ছে। তবে ঠিক কত টাকা পরিমাণ লোকসান হচ্ছে সেটি এককভাবে হিসাব রাখা হচ্ছে না। লোকসানের পরিমাণ রেল বিভাগ একত্রে করে থাকে।’ খবর কালের কণ্ঠ।

রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বিভিন্ন খাতে সীমাহীন দুর্নীতি, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের নামে লুটপাটের কারণেই প্রতিবছর পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েকে বিপুল পরিমাণ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। টিকিট ছাড়া ট্রেনে ওঠা যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের বেশির ভাগই হচ্ছে ভাগ-বাটোয়ারা। খবর কালের কণ্ঠ।

সপ্তাহের অন্তত দুই দিন রাজশাহী থেকে ঢাকায় যাতায়াত করেন মনিরুল ইসলাম নামের একজন শিক্ষা কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ’আমি তো দেখি আন্তনগর কোনো ট্রেনেই এখন আর সিট তেমন ফাঁকা থাকে না। রাজশাহী-ঢাকার ট্রেনগুলোয় সিট পাওয়া মুশকিল। তাহলে লোকসান হয় কিভাবে? আসলে লোকসান হয় লুটপাটের কারণে। রেলওয়েতে যে পরিমাণ লুটপাট হয়, তা কেউ দেখার নেই। এ কারণে লোকসানের পরিমাণ কমার সম্ভাবনাও তেমন নেই।’ খবর কালের কণ্ঠ।

প্রবীণ সাংবাদিক ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী জেলা সভাপতি আহমেদ শফিউদ্দিন বলেন, ’লোকসান হতে পারে। গণপরিবহনে জনগণের কল্যাণার্থে লোকসান হতেই পারে। কিন্তু লোকসানের তুলনায় সেবা একেবারে নগণ্য।’ তিনি বলেন, ’রেলের উন্নয়নের নামে বছরের পর বছর ধরে যে দুর্নীতি হচ্ছে, সেটি কে হিসাব রাখে। আবার টিকিট নিয়ে যে অনিয়ম রয়েছে সেটিও খুবই দুঃখজনক।’ সূত্র:কালের কণ্ঠ