বগুড়ায় এক তরুণীকে ধর্ষণের পর তাঁকে ও তাঁর মাকে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি শ্রমিক লীগ নেতা তুফানের স্ত্রী আশা সরকার, গাড়িচালক জিতু ও তুফানের সহযোগী মুন্নাকে গ্রেপ্তারের পর বগুড়া পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গত সোমবার সকালে বগুড়া থানা পুলিশের কাছে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়। (কালের কণ্ঠ, ৩১ জুলাই ২০১৭)
বগুড়ায় সদ্য এসএসসি পাস করা এক ছাত্রীকে ধর্ষণ এবং পরে বিচারের নামে মাসহ তাঁর মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনায় প্রধান আসামি শ্রমিক লীগ নেতা তুফান সরকারসহ গ্রেপ্তার তিন আসামির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গত রোববার দুপুরে বগুড়ার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শ্যাম সুন্দর রায় তাঁদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। (বাংলা ট্রিবিউন, ৩০ জুলাই ২০১৭)
খুন, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, দখল সবকিছুই ডালভাত তাঁর কাছে। ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মাদক ব্যবসা ও চোরাচালানের ছয়টি মামলার আসামি এই তুফান সরকার। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থেকে ছয় বছরে গাড়ি, বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ অঢেল সম্পদের মালিক বনেছেন। প্রশাসন আর নেতাদের হাতে রাখতে ঢেলেছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। ক্ষমতা আর অর্থের একচ্ছত্র দাপটে এত দিন নানা অপকর্ম করলেও দলীয় নেতাদের আশীর্বাদে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছেন তিনি।
নানা অপকর্মে জড়িত থেকেও বাগিয়েছেন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন শ্রমিক লীগের শহর শাখার শীর্ষ পদ। (প্রথম আলো, ৩১ জুলাই ২০১৭)
উপরোক্ত খবরগুলো দেশের প্রথম সারির অনলাইন ও সংবাদপত্রে প্রকাশিত। অনলাইন কিংবা সংবাদপত্রের এমন শিরোনামে আমরা স্তম্ভিত হয়। উদ্বিগ্ন হই মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা নিয়ে। প্রায়ই এমন সংবাদ শুনে থাকি। তাই হয়তো দুদিন পর আর আমাদের ভেতরে নাড়া দেয় না এমন বর্বর নির্যাতনের ঘটনা। আমাদের ভেতরের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গেলেও তুফান সরকারদের অনুভূতি প্রতিনিয়ত জাগ্রত হয়। এভাবেই তুফান সরকাররা তাঁদের রাজ্যের বিস্তার ঘটাতে থাকেন। সে রাজ্যে খুন, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও দখল সবকিছুই নিয়মিত ঘটতে থাকে আর তুফান সরকাররা মেতে ওঠেন হিংস্রতায়। তাঁদের হিংস্রতায় হার মানে সমাজের মানুষগুলোর মানবিক আত্মসম্মানবোধ ও নৈতিকতা। কিন্তু এই তুফান সরকারের বেড়ে ওঠা কিংবা এমন হিংস্রতার পেছনে দায় কার?
বগুড়ায় এসএসসি পাস করা ছাত্রীকে ধর্ষণ এবং পরে বিচারের নামে মাসহ তাঁর মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে তুফানসহ অন্য সহযোগীদের। আবার তুফানকে সংগঠন থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। এখন আমরা বিচারের আশায় আছি। আশা করি, দেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় তাঁর শাস্তি হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তুফান সরকারের বিচার হলেই কি আর এমন বর্বর কাণ্ড ঘটবে না সমাজে? কোন আশ্রয়ে তুফান সরকার এমন কর্মকাণ্ড করার সাহস পেল, সেটাও আমাদের দায়ের অন্তর্ভুক্ত। ক্ষমতা নাকি অর্থবিত্তের প্রভাবে সে চাঁদাবাজি, খুন ও ধর্ষণের মতো কাজগুলো হরহামেশা করে।
ছাত্রীকে ধর্ষণ এবং সালিশের নামে মা-মেয়েকে পিটিয়ে ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনায় জড়িত তাঁর স্ত্রী আশা, স্ত্রীর বোন কাউন্সিলর রুমকি। যাঁরা তুফান সরকারকে সহায়তা করেছে এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের মতো বর্বর নির্যাতন করতে? তাঁদের দায়ও কম নয়! কাদের মদদে তুফান অপরাধ জগতের সরকার হয়ে উঠত? তাঁদের দায়ই বা কম কিসে! যদি তাঁদেরও বিচার নিশ্চিত না করা হয়, তবে সমাজ ও পরিবারের দায়ও লাঘব হবে না। আর তখন এই দায় আমাদের সমাজে বসবাস করার সুস্থ স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তুফান সরকারের বিচার নিশ্চিত হওয়ার পর তুফান সরকার যে হিংস্র হয়ে উঠবে না, তার কি নিশ্চয়তা আছে? সেটা নিয়েও আমরা সন্দিহান! আবার যে কারোর সহযোগিতায় কিংবা প্রশ্রয়ে হিংস্র হয়ে উঠতে পারে।
ছাত্রী ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়ার পরপরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা বলেন, তুফান সরকার ইয়াবা-ফেনসিডিলের ব্যবসা, খুন-ধর্ষণ-চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। মাদক ব্যবসা ছাড়াও শহরে ব্যাটারিচালিত প্রায় ২০ হাজার অটোরিকশা ও ভ্যান থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা তুলতেন। শহরের চকসূত্রাপুর এলাকায় আলিশান বাসা তাঁর। শহরের চকযাদু ক্রস লেন সড়কে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। অস্ত্রধারী ক্যাডার নিয়ে চলাফেরা করেন। এত কিছুর পরও ক্ষমতাসীন দলের জেলার শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সখ্যের কারণে শ্রমিক লীগের পদ-পদবি বাগিয়েছেন। কিছুদিন আগেও শহর শ্রমিক লীগের সহসভাপতি ছিলেন। নেতাদের আশীর্বাদে কিছুদিন আগে কমিটির আহ্বায়কের পদ পান তিনি। (প্রথম আলো, ৩১ জুলাই ২০১৭)
এখন প্রয়োজন সর্বোচ্চ শাস্তি, যাতে কেউ তুফানের মতো ঘৃণ্য কর্মগুলো করার সাহস না পায়। এতেও আমাদের দায়মুক্তি হবে না। যদি না এসব তুফান সরকারদের বেড়ে ওঠাকে দমিয়ে দেওয়া না যায়। সে দমিয়ে দেওয়াটা হতে পারে পরিবার থেকে, সমাজ থেকে কিংবা রাজনৈতিক সংগঠনগুলোও থেকে। প্রথমেই সচেতন হতে হবে এসব তুফানকে কোনো ধরনের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে। কারণ এই তুফান সরকারদের অপরাধ জগতের সরকার হয়ে উঠতে আশ্রয়-প্রশ্রয়টুকুই যথেষ্ট।
একই সঙ্গে তুফান সরকারের কুকর্মের সহযোগীদেরও বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে সর্বোচ্চ শাস্তি, যাতে এমন বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডে আর কেউ সহায়তা না করে। তবেই এ দায় কিছুটা হলেও ঘুচবে!
লেখক : শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।