বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গত কয়েকদিন ধরে বর্তমান কমিটির পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এটাই প্রথম ঘটনা। আর এই চলচ্চিত্র শিল্পরা নানা রকম অভিযোগ এনেছে। আর এই চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সম্পর্কে অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী মুখ খুলতে শুরু করেছে। আর ইতিমধ্যে এই বিষয়ে অনেকে কথা বলেছেন। অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী আন্দোলনরত শিল্পদের পক্ষে কথা বলেছেন। আর আবার অনেকে শিল্পী সমিতির পক্ষে কথা বলেছেন। এবার এই বিষয়ে মুখ খুলেছেন চিত্রনায়ক রিয়াজ।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগর ও সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খানকে বয়কট করেছে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ১৮টি সংগঠন। এখন থেকে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট কোনো অনুষ্ঠানে জায়েদকে কেউ আমন্ত্রণ জানাতে পারবেন না, তিনিও কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারবেন না। যে আমন্ত্রণ করবেন, তাকেও একঘরে করবে ১৮ সংগঠন, এমন ঘোষণাই দেয়া হয়েছে।

গত বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের জহির রায়হান কালার ল্যাব মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান চলচ্চিত্রের উন্নয়নে কাজ না করে ব্যক্তিস্বার্থে নিজের পরিচয় ব্যবহার করছেন।

চলচ্চিত্র পরিবারের দাবি, জায়েদ খান অন্য শিল্পীদের হয়রানি করেন, মিথ্যা মামলার ভয় ও ক্ষমতার দাপট দেখান। তার কাজের সমালোচনাকারীকে সমিতির সদস্যপদ বাতিলসহ নানাভাবে ক্ষতির চেষ্টা করেন।
এদিকে রোববার ১৯ জুলাই দেখা যায় আরেক চিত্র। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বিএফডিসির গেটের সামনে মিশা-জায়েদের পদত্যাগ চেয়ে রাস্তায় নেমেছেন শিল্পী সমিতির ভোটাধিকার হারানো ১৮৪ জন শিল্পী। সেদিন বেলা সাড়ে ১১টায় এসব শিল্পী এফডিসির গেটে মানববন্ধন করেন। সেই সঙ্গে ’যে নেতা শিল্পীদের সম্মান করে না, তাকে আমরা চাই না’ স্লোগান দিয়ে ভোটাধিকার ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি মিশা-জায়েদের পদত্যাগ দাবি করেন।
হঠাৎ করেই শিল্পী সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারির বিরুদ্ধে মানববন্ধন এবং পদত্যাগ দেশের চলচ্চিত্র শিল্পী ও শিল্পীদের সমিতির জন্য একটি অপমান ও অসম্মানের ব্যাপার বলে মনে করছেন চিত্রনায়ক রিয়াজ। তিনি বলেন, ’করোনার কারণে আমরা সবাই এখন একটু দূরে আছি এফডিসি থেকে। গণমাধ্যমে দেখেছি শিল্পী সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারিকে চলচ্চিত্রের সব সংগঠন মিলে বয়কট করেছে। সেদিন আবার দেখলাম শিল্পীরা পদত্যাগ চাচ্ছে এই দুই শিল্পী নেতার। এটা হতাশার বিষয় আমাদের জন্য।
প্রথম কথা হচ্ছে সবগুলো সমিতি মিলে যখন কোনো একটি সিদ্ধান্ত নেয় কোনো কারণ ছাড়া তো নিশ্চয়ই নেয়নি। কিছু কিছু কারণ আমি গণমাধ্যমের বরাতে জানতে পেরেছি। সেগুলো যদি সত্য হয় তাহলে খুবই আশংকাজনক ব্যাপার এটি চলচ্চিত্রের শিল্পী ও তাদের সমিতির জন্য। একটা অন্ধকার সময় যেন অপেক্ষা করছে বলে মনে হয়। শিল্পী সমিতি একটি মহান সমিতি। এই সমিতি রাজ্জাক (নায়করাজ রাজ্জাক) আংকেলদের মতো উঁচু মাপের শিল্পীদের হাতে গড়া। অনেক পুরনো একটি সংগঠন। অনেক ভালো ভালো মানুষ এই সমিতিতে ছিলেন। দীর্ঘদিনের এই সমিতিতে এমন কাণ্ড কখনো ঘটেনি গেল ১৯ জুলাই যা ঘটলো। শিল্পীরা তাদের সভাপতি ও সেক্রেটারির পদত্যাগ চাইলো। এটা আমাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। শিল্পীদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে বলেই তারা আজ রাস্তায় নেমেছে।’
’যখন ১৮৪ জন শিল্পীকে বাতিল করা হলো তখন আমি নিজেও কমিটিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ছিলাম। তাই আমি এর সাক্ষী। এদেরকে অন্যায়ভাবে বাদ দেয়া হয়েছে। আমরা কয়েকজন যখন ব্যাপারটি নিয়ে কথা বলতে চাইলাম তখন এই দুজনের সঙ্গে অনেক বাদানুবাদ হয়েছিল। আমাদের বলতে দেয়া হয়নি কোনো কথা। স্পষ্ট দেখছিলাম সবাইকে অন্ধকারে রেখে কেউ কেউ স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এসব কারণেই কিন্তু আমি আর পরে তাদের সঙ্গে নির্বাচনে যাইনি। আমার কাছে মনে হয়েছে যদি নিজের কমিটির অনিয়মকেই রুখতে না পারি তাহলে আর পদে থাকার দরকার নেই। একটা বিষয় কি, যে কোনো পদেই ভালো মানুষদের থাকা উচিত। কারণ তাদের হাতে অনেকের দায়িত্ব থাকে। এসব কারণেই সরে এসেছিলাম। আর ইলেকশন করিনি। আরও অনেকেই সরে এসেছেন যারা এদেশের চলচ্চিত্রের প্রথম সারির এবং যথেষ্ট সম্মানিত ও দর্শকপ্রিয় তারকা’- যোগ করেন তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত এ নায়ক।

তিনি আরো বলেন, ’একবার ভাবুন, এই করোনার ক্রান্তিকালে তারা রাস্তায় নেমেছে। মানববন্ধন করেছে। পরিস্থিতি কি পর্যায়ে গেলে তারা এমন আতঙ্কের মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদেরই নেতাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে! আমার কাছে খুব কষ্ট লেগেছে সবদিক থেকেই। শিল্পীদের জন্য এটি কাম্য নয়, নেতাদের জন্যও নয়। আমি চাই যেভাবেই হোক সমিতি ও শিল্পীরা ভাল থাকুক। কিন্তু তা হচ্ছে না, এটা স্পষ্ট। আমার কাছে মনে হয়েছে যেসব দাবিতে শিল্পীরা আজ রাস্তায় তার সবগুলোই যৌক্তিক। শুধুমাত্র সভাপতি আর সেক্রেটারি নয়, পুরো ২১ জনকে নিয়ে একটি ক্যাবিনেট হয়। ২১ জনের মধ্যে ওই দুইজন ছাড়া আর কারও বিরুদ্ধে কিন্তু কথা উঠছে না। কেন? আমি জানি না কেন। তবে কোনো কারণ ছাড়া যে হচ্ছে না সেটা তো বোঝাই যায়।’

এদিকে, এই শিল্পী সমিতির সম্পর্কে অনেকে কথা বলছেন। চিত্রনায়িকা মৌসুমিও এই শিল্পী সমিতির বিপক্ষে কথা বলেছেন। আর চিত্রনায়ক বলেন এই সমস্যা সব সময় থাকবে না। এছাড়াচ তিনি আরও বলেন এখানে যারাই ক্ষমতায় থাক না কেন সবাই অন্যার জন্য কাজ করবে এটাই তার আশা। আর যে সকল ব্যক্তিরা নির্বাচনে জয়ি হবে তাদের উচিত সংগঠনের জন্য বিনয়ী হওয়া। এছাড়া এই সংগঠনের জন্য ত্যাগী হতে হবেন বলেন তিনি। আর এই সংগঠনে কারো নাম বা ক্ষমতার জোর দেখানো একেবারেই কাম্য নয়। আর সবাই মিলে কাজ করলে অবশ্যই সিনেমার সুদিন ফিরে আসবে বলেন তিনি।