সত্তরের দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তিনি অভিনয়ের জাদুতে মুগ্ধ করে রেখেছেন দর্শকদের। টিভি নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপন সব ক্ষেত্রেই তিনি সফল। লেখালেখিও করেছেন সমানতালে। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন একুশে পদকসহ নানা সম্মাননা।
চার দশক ধরে অভিনয় করছেন। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমাকে কীভাবে দেখছেন?

দেখতে দেখতে অভিনয়ে চার দশক পার করছি; এটা ভাবতেই অবাক লাগে। মনে হয় এই তো সেদিন অভিনয় ভুবনে এসেছি। বাবার মঞ্চ নাটক দেখার শখ ছিল। তার সঙ্গে যেতাম মঞ্চ নাটক দেখতে। সেই থেকেই শুরু হয় নাটক আর অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা। মাত্র ১০ বছর বয়সেই সুযোগ পেয়ে যাই মঞ্চে অভিনয়ের। পড়াশোনা শেষ করে যোগ দিই ঢাকা ওয়াসার প্রকৌশলী পদে। এ পেশায় কাজ শুরু করলেও তার মূল আকর্ষণ ছিল অভিনয়ের প্রতি। শেষমেশ অভিনয়ে থিতু হই। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে জীবনে বেশ অভিজ্ঞতাময় সফর হয়েছে বলে আমি মনে করি।

শৈশব-কৈশোরে ফিরে যেতে ইচ্ছা করে না?

বাবার চাকরির সুবাদে আমার পড়াশোনা ও জীবনের সোনালি সময় চট্টগ্রামে কেটেছে। অনেকটা সময় সেখানে বসবাস করেছি বলেই কেউ কেউ মনে করেন আমি চাটগাঁইয়্যা। অবশ্য চট্টগ্রামের স্মৃতি কখনও ভোলা যাবে না। আর তাই সুযোগ পেলেই সেখানে চলে যাই। সেখানকার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বহু পুরনো। ১০ বছর বয়সে প্রথম অভিনয় করেছিলাম। নাটকটির নাম ছিল ’টিপু সুলতান’। তখনই হয়তো ভাগ্যে লেখা হয়ে গিয়েছিল আমি অভিনয় করব। চট্টগ্রামে কলেজিয়েট স্কুল এবং কলেজে আমার অনেক স্মৃতি রয়েছে। এখনও চট্টগ্রামে গেলে আমি একবার হলেও টাইগারপাস যাই। টাইগারপাস আমার জীবনে অন্যরকম এক স্মৃতির জায়গা। ছোটবেলায় রেললাইন আমার কাছে বড় স্মৃতি। বাড়ির পাশেই রেললাইন। লাইনে কান পেতে রেলের শব্দ শোনা, গুলতি দিয়ে পাখি শিকার, চলন্ত ট্রেনে ওঠানামা করেছি। বেশি মনে পড়ে রেললাইনে চকমকি পাথর দিয়ে আগুন জ্বালানো। ছেলেবেলায় সাইকেল চালিয়ে পতেঙ্গা সৈকতে যেতাম। পিকনিক করতাম। পাথর, কাঁকড়া কুড়াতাম। শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি মনে করে মাঝে মধ্যে নস্টালজিক হয়ে যাই।

স্কুলজীবনের কিছু স্মৃতির কথা বলবেন কী?

আমার আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রামের টাইগারপাস কিন্ডারগার্টেন স্কুলে। কলেজিয়েট স্কুলেও পড়েছি। পাহাড়তলী রেলওয়ে স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেছি। চট্টগ্রাম কলেজে পড়ালেখা করেছি। বেড়ার স্কুল ছিল, টিনের ছাদ। মৌলভি সাহেবের পড়া না পারলে বেড়ার ফাঁক দিয়ে দৌড়ে পালাতাম। স্যারও আমাদের পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছেন, আমরাও দৌড়াচ্ছি। রেললাইন ধরে কলেজিয়েট স্কুলে হেঁটে হেঁটে আমরা যেতাম মাদারবাড়ি পর্যন্ত। স্কুলজীবনের একজন স্যারের কথা মনে পড়ে। সৈয়দ স্যার। তিনি পড়া পারলেও বেতের বাড়ি মারতেন, না পারলেও মারতেন। ওটা স্যারের একটা ’আদরের মার’ ছিল।

বর্তমানে বাবার চরিত্রেই বেশি দেখা যায় আপনাকে। দায়িত্বশীল চরিত্র চিত্রণে কতটুকু তুষ্ট থাকেন?

এখন বেশিরভাগ নাটকই তারুণ্যনির্ভর। সেখানে বাবার চরিত্রের গুরুত্ব কমই থাকে। কিছু করার নেই। অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিয়েছি। অনেক কাজ ইচ্ছার বিরুদ্ধেও করতে হয়। তরুণ বয়স থেকেই বাবার চরিত্রে অভিনয় করছি। এটা আমার মাথায় চুল কম ছিল বলে কাজটি করতে অনেক সহজ হয়েছে। আমি গোলাম মুস্তাফা, মমতাজউদদীন, সিরাজুল ইসলাম, ফেরদৌসী মজুমদারের বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছি। সুতরাং আমি মনে করি, এটা আমার একটা গর্বের জায়গা। বাবার জীবনেও অনেক ক্রাইসিস থাকতে পারে। এসব নিয়ে নাটক কম হয়। নির্মাতাদের এ নিয়ে ভাবতে হয়। বাবার চরিত্রকে উপেক্ষা করে কখনও দর্শকপ্রিয় নাটক হতে পারে না।

টিভি মিডিয়ার বর্তমান অবস্থা কেমন মনে হয়?

মিডিয়ায় চরম দুর্দিন চলছে। কারণ, এটি পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে। সৃজনশীল মানুষদের হাতে নেই বললেই চলে। অভিনয়, পরিচালনা- সব ক্ষেত্রেই চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। বেড়েছে এজেন্সিনির্ভরতা। বাজেট কমেছে। যে জন্য কাজের মান নেমে যাচ্ছে। এখনকার নাটকে সিনিয়র শিল্পীদের চরিত্র থাকেই না। এসবের মধ্যেও কাজ চলছে, কাজ করছি।

পঁচাত্তরে পা দিয়েছেন। জীবনে কোনো অপ্রাপ্তি আছে?

জীবনে চেয়েছি কম, পেয়েছি বেশি। এ কারণেই আমি বেশি সুখী। সাংসারিক, অভিনয় জীবন আমার ধন্য। পরিপূর্ণ জীবনে সবার ভালোবাসা নিয়ে বাকি জীবনটা হাসি-খুশিতে কাটিয়ে দিতে চাই।