ক্যাসিনোতে র‍্যাবের অভিযান চালাবার পরই বেরিয়ে এসেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের (আরামবাগ-ফকিরাপুল) কাউন্সিলর যুবলীগ নেতা এ কে এম মমিনুল হক সাঈদের নাম। এছাড়া একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের (বাহফে) সাধারণ সম্পাদকও। তিনি টাকার পাহাড় জমাবার পরও কীভাবে কোথা থেকে আরও টাকা পাওয়া যায় তাও ভালো করেই প্রয়োগ করেন।
তিনি এলাকাবাসীর নিরাপত্তার কথা বেশ ভাবেন, কিন্তু তার মধ্যেও রয়েছে টাকা কামানোর চাতুর্য্যতা। তিনি তার এলাকায় নিরাপত্তার কথা বলে বিভিন্ন অলি-গলির মুখে ১৬টি লৌহ নির্মিত গেট বসিয়েছেন। এ সকল এলাকাতে তিনি রাতে দু’জন করে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দিয়েছেন, যারা মধ্যরাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ডিউটি পালন করে থাকে। তিনি গেট বসানোর ব্যয় ও নিরাপত্তাকর্মীদের মাসিক বেতন প্রদান হিসেবে কক্ষপ্রতি (ফ্ল্যাট বা বাড়িপ্রতি নয়) প্রত্যেক মাসে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা আদায় করেন। তার এলাকায় এরূপভাবে ৩০,০০০ কক্ষের মালিক বা যারা ভাড়া থাকেন তাদেরকে প্রতিমাসে এই টাকা দিতে হয়।

তার এ কৌশল থেকে তার প্র্ত্যেক মাসে আদায় হয় কোটি টাকারও বেশি। এ সকল গেট দিয়ে যদি কেউ কোনো ধরনের নির্মান সামগ্রী বা ঘরের সামগ্রী অর্থাৎ কোনো ইট-বালু-সিমেন্ট, আসবাব বা অন্যান্য জিনিসপত্র প্রবেশ করাতে গেলেই তাকে দিতে হয় বাড়তি মোটা অঙ্কের টাকা। তার নিয়োগ দেয়া একজন নিরাপত্তাকর্মীকে প্রতিমাসে বেতন হিসাবে দেন মাত্র ৫ হাজার টাকা, যা উঠানো টাকার তুলনাই নিতান্তই কম। নিয়োগ দেয়া পনেরো জন নিরাপত্তাকর্মীকে দেয়া বেতন হিসাবে মাসে লাখখানেক টাকা ব্যয় করেন। বাকি টাকা থেকে তার পকেটে ঢোকে মাসে কোটি টাকারও উপরে। অথচ এলাকাবাসী এ ব্যাপারে মুখ খুলতে পারেন না মমিনুল হক সাইদের ভয়ে। এই কাজ তিনি গত তিন বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছেন।

অবৈধ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে সম্প্রতি অভিযান শুরুর পর সামনে চলে আসে মমিনুল হক সাইদের নাম। তবে কেবল ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগই নয়, ওই এলাকায় বাড়ি দখল, ফ্ল্যাটের কাজ বন্ধ করে ডেভেলপারের কাছ থেকে চাঁদা বা ফ্ল্যাট আদায়, ফুটপাতে চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম করে চলেছেন। এলাকায় যেসব দোকানপাট রয়েছে, তাদেরও চাঁদা দিতে হয়। জোর করে ওই এলাকার কারখানার শ্রমিকদের মিছিলে নিয়ে যান। এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপ করে এ রকম অসংখ্য অভিযোগ পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া দুই মাস আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয় জানান, ওই প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রীর একটি প্লট ছিল আরামবাগ এলাকায়। তার স্ত্রী প্লটটি একটি ডেভেলপারকে দেন। ডেভেলপার কাজ শুরু করতে গেলে মমিনুল হক সাইদ বাধা দেন। তিনি ওই ভবনের চারটি ফ্ল্যাট দাবি করেন। ডেভেলপার দিতে অস্বীকৃতি জানালে কাজ বন্ধ করে দেন। এক পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রী বিষয়টি লিখিত আকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা মেলে। ওই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে মমিনুল হক সাইদের বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ পায় একটি গোয়েন্দা সংস্থা।

২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর দিনই মীর কাসেম আলীর মালিকানাধীন ৮৯ ও ৮৯/১ আরামবাগ কালভার্ট রোডের আটতলা বিপিএল (বাংলাদেশ পাবলিকেশনন্স লিমিটেড) ভবনটি সাঙ্গপাঙ্গো নিয়ে দখল করে নেন মমিনুল হক সাইদ। ভবনটিতে শখানেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিটির ভাড়া ৬ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। প্রতি মাসে এ ভবনের ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে ৭-৮ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করছেন তিনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটিতে দৈনিক স্বাধীন বাংলা নামে একটি পত্রিকা অফিসসহ প্রেস, রঙ, যন্ত্রাংশের দোকানসহ বিভিন্ন ধরনের দোকান রয়েছে। কিন্তু দোকান মালিকরা এসব নিয়ে মুখ খুলতে চান না।

জানা যায়, দখলের পরপরই মার্কেট পরিচালনা কমিটির লোকজন ও জামায়াতের কিছু অনুসারী মার্কেটটি দখলমুক্ত করার ব্যাপারে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা কার্যালয়ে সভা করেছিলেন। পরে তারাও মমিনুল হক সাইদের রোষানলে পড়েন। এখন আর কেউ এ নিয়ে মুখ খোলেন না।

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ভবনের পেছনে ও বিপিএল ভবনের পাশেই প্রায় এক বিঘা জমির ওপর একটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করে ডেভেলপার কোম্পানি ডোম ইনো। সেখানে একাধিক ফ্ল্যাট দাবি করেন মমিনুল হক। ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর কাজ বন্ধ করে দেন তিনি। এক বছর ধরে দেনদরবার চলে। সম্প্রতি আবার পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে ডোম ইনোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। আরামবাগের মেরিনার্স ক্লাবের পাশেও একটি ডেভেলপারের বহুতল ভবন থেকে দুটি ফ্ল্যাট দাবি করার অভিযোগ আছে মমিনুলের বিরুদ্ধে।

১৮৮ আরমাবাগ সার্কুলার রোডের একটি পুরনো বহুতল ভবনের জাল দলিল করে বছর তিনেক আগে দখলে নেন মমিনুল হক। এ নিয়ে ওই ভবনের ভাড়াটিয়ারা আপত্তি করলেও পরে তা ধোপে টেকেনি। বর্তমানে ওই ভবন নিয়ে দু’পক্ষের মামলা চলছে। ভবনটির নিচতলায় ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের একটি অফিস রয়েছে।

দু’বছর আগে আরামবাগ ও দিলকুশা ক্লাব দখলে নেন মমিনুল হক সাইদ। আগে আরামবাগ ক্লাবের সভাপতি ছিলেন নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। নানা কৌশল করে মমিনুল সভাপতি হয়ে যান। দুটি ক্লাবেই দেদার ক্যাসিনো চলেছে এতদিন। ওখান থেকে তার প্রতিদিন বিপুল আয় হয় বলে স্থানীয়রা জানান।

বছর তিনেক আগে কমলাপুর স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলার রেফারিংয়ের ঘটনার সূত্র ধরে মমিনুল হক তার লোকজন নিয়ে বাফুফে ভবন ও সেখানে রাখা গাড়িগুলো ভাংচুর করে। এ ঘটনায় একদিন মতিঝিল থানা হাজতে থাকতে হয় তাকে।

অবৈধ হকার উচ্ছেদের জন্য গুলিস্তান-মতিঝিল এলাকার ফুটপাতে অভিযানে নামলে তিনি বাধা দেন। তিনি এসবের এক পর্যায়ে মেয়র সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে দাড়াতে শুরু করেন এবং তার অনেক কর্মকান্ডে বিরুদ্ধাচরন করেন। এখানেও রয়েছে বানিজ্যের বিষয়টি, কারন ফুটপাতে যেসব হকাররা বসতো তাদের কাছ থেকে মমিনুল হক প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা তুলতেন। পরবর্তীতে তিনি তার এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেসব কর্মচারী রয়েছে তাদেরকে হকার সাজিয়ে মেয়রের বিরুদ্ধে মিছিল করান এবং সেখানে প্রেসকেও যুক্ত করেন। আর যেখান থেকে তিনি চাঁদা পান না সেগুলোকে বন্ধ করে দেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে শাপলা চত্বরের পাশে সন্ধ্যায় মাছ-তরকারির দোকানগুলো। কারন সেখান থেকে তার কোনো আয় হয় না। পরে অবশ্য সমঝোতার মাধ্যমে পুনরায় শুরু হয়।

এলাকাবাসীরা জানান, মমিনুলের রয়েছে বিশেষ একটি বাহিনী যারা তার নির্দেশে এই সমস্ত অপকর্ম চালিয়ে থাকেন। তার বাহিনীতে যেসকল লোক কাজু করে তার মধ্যে রয়েছে আরামবাগের বাবু, দিলকুশা ক্লাবের আবদুল মান্নান, মতিঝিল থানার ছাত্রলীগ নেতা হাসান, স্থানীয় যুবলীগের জামাল প্রমুখ। তিনি মাসের ৩০ দিনের মধ্যে ১৫ দিনই কাটান সিঙ্গাপুরে। ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান আরম্ভ হওয়ার কিছুদিন পূর্বেও তিনি যান সিঙ্গাপুরে। এলাকাবাসী জানান, এবার মনে হয় না মমিনুল তাড়াতাড়ি দেশে ফিরে আসবেন।